রাশিয়ার বিমান হামলার পর বিদ্যুৎ বিভ্রাটই নয়, নিজের ঘরের ভেতরের তীব্র ঠান্ডাই এখন সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ হয়ে উঠেছে ইউক্রেনের বহু মানুষের জন্য। দনিপ্রো শহরের বাসিন্দা ইউলিয়া হাইলুনাস জানাচ্ছেন, জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার পর থেকে তার বাসায় কেন্দ্রীয় গরমের ব্যবস্থা নেই।
ঠান্ডা সামলাতে তিনি ভারী কোট ও টুপি পরে থাকেন, পা গরম রাখতে গরম পানিভরা হাঁড়ির ওপর রাখেন। তাতেও কাজ না হলে কয়েক মিনিট ব্যায়াম করে শরীর গরম করার চেষ্টা করেন। তাপমাত্রা শূন্যের ওপরে থাকলে কোনোমতে টিকে থাকা যায়, কিন্তু আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে, সপ্তাহান্তে দনিপ্রোতে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ২০ ডিগ্রির নিচে। কিয়েভসহ অন্যান্য এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ইউলিয়ার আশঙ্কা, এত কম তাপমাত্রায় গরমের পাইপ ফেটে গেলে সেগুলো আবার মেরামত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, সেটি হবে একেবারে ভয়াবহ বিপর্যয়।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সময় এক সপ্তাহের জন্য ইউক্রেনের বড় শহরগুলোতে হামলা বন্ধ রাখতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মত হয়েছেন। ট্রাম্প এটিকে সৌজন্যমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করলেও বিস্তারিত তথ্য ছিল সীমিত। পরদিন ক্রেমলিন জানায়, এই সদিচ্ছার মেয়াদ রোববার শেষ হবে, ঠিক যখন সবচেয়ে কড়া শীত শুরু হবে।
বাস্তবে রাশিয়া আদৌ হামলা থামিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কারণ সাধারণত বড় আকাশপথের হামলার মধ্যেও কয়েক দিনের বিরতি থাকে। ২৪ জানুয়ারির পর থেকে বড় কোনো হামলা না হলেও ইউলিয়া মনে করেন, যেকোনো সময় আবার আঘাত আসতে পারে।
তার ধারণা, রাশিয়ার উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করা, যাতে তারা যুদ্ধ থামাতে যেকোনো শর্ত মেনে নিতে চাপ দেয়। তবে তিনি বলেন, এইভাবে ইউক্রেনীয়দের ভাঙা যাবে না।
তবে বাস্তবতা হলো, ইউক্রেনের গরমের ব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধ আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষের অতিরিক্ত ক্ষতি হয় এমন অবকাঠামোতে হামলা নিষিদ্ধ। তবু টানা চার শীত ধরে রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে জ্বালানি নেটওয়ার্কে আঘাত হানছে, ফলে প্রতিবারই সেটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শনিবার পশ্চিম ও মধ্য ইউক্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সরকার জানায়, রোমানিয়া ও মলদোভার সঙ্গে সংযুক্ত লাইনে কারিগরি ত্রুটির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। সারা দেশে প্রকৌশলীরা দিনরাত কাজ করে বিদ্যুৎ ফেরানো এবং বরফে জমে যাওয়া গরমের পাইপ মেরামতের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
জ্বালানি খাতে হামলা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু খুব কম ইউক্রেনীয়ই রাশিয়ার ওপর ভরসা করতে পারছেন। কারণ অন্যদিকে হামলা থেমে নেই। শুক্রবার খেরসনে গোলাবর্ষণে একটি বাসে আঘাত লেগে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ড্রোন হামলার সতর্কতাও জারি ছিল।
পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টলাইনে লড়াই আগের মতোই তীব্র, যার ফলে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। ফ্রন্ট থেকে কিছু দূরের শহর পাভলোহরাদে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো সহায়তা কেন্দ্রে ভিড় করছে। সামান্য নগদ অর্থ, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদের পক্ষ থেকে।
ভাসিলকিভকা ছেড়ে আসা ক্যাটেরিনা কাঁদতে কাঁদতে জানান, আজীবনের বসতভিটা ছেড়ে যাওয়া যেন নিজের একটি অংশ হারানোর মতো। তবে দুই ছোট সন্তানকে বিস্ফোরণের ভয় থেকে বাঁচাতে তার আর উপায় ছিল না। তার মা ইরিনা বলেন, আগে গ্রামটি তুলনামূলক নিরাপদ ছিল, এখন সেখানে প্রতিদিন ড্রোন হামলা হচ্ছে।
ট্রাম্প জ্বালানি সমঝোতাকে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির উপায় হিসেবে দেখছেন। ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতার বার্তা দেওয়া যায়।
রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতে আরেক দফা আলোচনা হওয়ার কথা, যদিও উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিরা এতে থাকবেন কি না, তা অনিশ্চিত। ইউক্রেনের দাবি, পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদই এখন প্রধান বাধা। তবে রাশিয়ার কর্মকর্তারা কোনো দ্রুত সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন না।
ইরিনার কথায়, ইউক্রেনের মানুষ শান্তি চায়, কিন্তু প্রশ্ন একটাই—রাশিয়াকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়, যে তারা আবার পেছন থেকে আঘাত করবে না।
এই যুদ্ধের অন্ধকার ও তীব্র শীতের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক ইউক্রেনীয়ের কাছে মনে হচ্ছে, মস্কো কেবল সময় ক্ষেপণ করছে। সামনে কয়েক দিন ও সপ্তাহই বলে দেবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।














