যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুনভাবে শুরু করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় লন্ডন ও বেইজিং উভয়ই বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ খুঁজছে।
২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। সফরে স্টারমার ব্রিটিশ আর্থিক খাত, ওষুধ শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গাড়ি উৎপাদন খাতের সক্ষমতা তুলে ধরেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে চীনকে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে।
যদিও কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়নি, তবে এই সফর যুক্তরাজ্য ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কে ধীরে কিন্তু বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের সূচনা করেছে। ভিসা সুবিধা, সেবা খাত, স্বাস্থ্য, সবুজ প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সংলাপ পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ব্রিটিশ কোম্পানির জন্য চীনা বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে।
সফরে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ঘোষণা আসে একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে, যা আগামী চার বছরে চীনে প্রায় দেড়শ কোটি ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এই বিনিয়োগ গবেষণা ও ওষুধ উৎপাদন সম্প্রসারণে ব্যবহার হবে, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে চীনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
জ্বালানি খাতে একটি ব্রিটিশ কোম্পানি প্রথমবারের মতো চীনের বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করা।
এ ছাড়া চীন স্কচ হুইস্কির ওপর শুল্ক অর্ধেকে নামাতে সম্মত হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, এতে আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসতে পারে। স্কটল্যান্ডের হুইস্কি শিল্পকে দেশটির অন্যতম গর্ব হিসেবে উল্লেখ করে স্টারমার বলেন, বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ভেতরে সুফল আনা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য চীনে সর্বোচ্চ ত্রিশ দিনের ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ। পর্যটন ও ব্যবসায়িক সফরের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যকে আরও অনেক দেশের সমতায় নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি অবৈধ মানবপাচার প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর ইউরোপের একটি বড় অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বার্তা দেয়। এতে উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক যান, সৌর প্যানেল ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে চীনা বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। বিদেশি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে চীনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে জটিল নিয়ম, بيرোক্র্যাটিক বাধা ও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ করে আসছেন। এসব কারণে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
স্টারমারের জন্য এই সফর ছিল উচ্চ ঝুঁকির একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি পূরণে তার সরকার চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই এখন লন্ডনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স, কানাডা ও ফিনল্যান্ডের নেতারাও বেইজিং সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে মাঝারি শক্তিধর দেশগুলো নতুন বাজার ও অংশীদার খুঁজতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য ও চীনের সাম্প্রতিক সমঝোতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ নজর কেড়েছে।















