ডেনমার্কের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরে উত্তাল উত্তর সাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি পুরোনো তেলক্ষেত্রকে নতুনভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য। প্রায় নিঃশেষিত এই তেলক্ষেত্রকে রূপান্তর করা হচ্ছে বিশাল কার্বন সংরক্ষণ প্রকল্পে, যেখানে বায়ুমণ্ডল উষ্ণকারী কার্বন ডাই অক্সাইড স্থায়ীভাবে ভূগর্ভে জমা রাখা হবে।
একটি হেলিকপ্টার সাগরের ওপর ভেসে থাকা প্ল্যাটফর্মে নামার আগে পাইলট সতর্কবার্তা দেন। কাছেই আরেকটি তেল রিগ দেখা যায়, যা বহু বছর ধরে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন সেই ক্ষেত্রেই দেওয়া হচ্ছে দ্বিতীয় জীবন। এই প্রকল্পের নাম গ্রিনস্যান্ড ফিউচার।
সিরি নামের মূল প্ল্যাটফর্মে রয়েছে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, যেখানে সমুদ্রের মাঝখানে কর্মরত শ্রমিকরা কাজ করছেন। বহু দশক ধরে যে বিশাল পাইপলাইন দিয়ে সমুদ্রতল থেকে তেল ও গ্যাস তোলা হতো, এখন সেগুলোর মাধ্যমেই উল্টোভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড মাটির নিচে পাঠানো হবে।
প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন একটি আন্তর্জাতিক শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান নির্বাহী। তার ভাষায়, এতদিন মাটি থেকে যা উত্তোলন করা হয়েছে, এবার সেখানে গ্যাস ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় কার্বন ধরন ও সংরক্ষণ, যার মাধ্যমে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রেখে স্থায়ীভাবে ভূগর্ভে জমা করা হয়।
এই উদ্যোগ চালু হলে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম বড় আকারের সমুদ্রভিত্তিক কার্বন সংরক্ষণ কেন্দ্র হবে। চলতি বছর প্রায় চার লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড এখানে জমা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে তা বাড়িয়ে বছরে প্রায় আশি লাখ টনে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডেনমার্কের মোট নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যের একটি বড় অংশ এতে পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞান সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা উভয়ই বলছে, দ্রুত ও গভীর নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কার্বন ধরন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিও বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে নিট শূন্য নির্গমন অর্জন, যেখানে এই প্রযুক্তিকে অপরিহার্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, এতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা দুর্বল হতে পারে। পাশাপাশি এটি ব্যয়বহুল এবং একই অর্থে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন বায়ু ও সৌর শক্তি কিংবা বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিনিয়োগ করলে আরও বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব বলে তাদের মত।
কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, যেখানে নির্গমন কমানো অত্যন্ত কঠিন, সেখানে এই প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটি যুক্তিসংগত নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সমস্যা তৈরি হতে পারে, কারণ একবার সমুদ্রতল কার্বন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার হলে পরে তা অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা কঠিন হবে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে শত শত কার্বন সংরক্ষণ প্রকল্প চালু রয়েছে বা উন্নয়নাধীন। ইউরোপে বিশেষ করে উত্তর সাগর ঘিরে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্যে বড় প্রকল্প এগিয়ে চলছে। এর একটি কারণ হলো দীর্ঘদিনের তেল ও গ্যাস উত্তোলনের ইতিহাস। ফলে সমুদ্রতলের ভূতত্ত্ব ভালোভাবে জানা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল আগে থেকেই রয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই অঞ্চলের শিলাস্তরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাঁক রয়েছে, যেখানে গ্যাস আটকে রাখা সম্ভব। তার ওপর প্রায় এক কিলোমিটার পুরু কাদামাটির স্তর ঢাকনা হিসেবে কাজ করবে, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তেল ও গ্যাস আটকে রেখেছিল। একই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইডও নিরাপদে সংরক্ষিত থাকবে।
এই রূপান্তর সমুদ্রের শ্রমিকদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। আগে যেখানে টারবাইন ও গ্যাস কম্প্রেসর রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, ভবিষ্যতে সেখানে উচ্চচাপের পাম্প দেখভালের কাজ হবে, যা কার্বন ডাই অক্সাইড মাটির নিচে পাঠাবে।
একজন স্থানীয় কর্মীর ভাষায়, একসময় এই অঞ্চলের মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত, পরে তেল ও গ্যাস শিল্পে কাজ শুরু করে। এখন সবুজ রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে, যা দেখাটাই রোমাঞ্চকর।
















