যুক্তরাজ্যের অভিবাসন রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি লক্ষণীয় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে কঠোর সীমান্ত ও অভিবাসন নীতির পক্ষে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের অনেকেই জাতিগত সংখ্যালঘু পটভূমি থেকে উঠে আসা রাজনীতিক। সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব সাজিদ জাভিদের বক্তব্য থেকে শুরু করে বর্তমান স্বরাষ্ট্রসচিব শাবানা মাহমুদের নীতিগত অবস্থান পর্যন্ত এই প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সাজিদ জাভিদ একসময় মন্তব্য করেছিলেন, বর্তমান নিয়ম থাকলে তাঁর নিজের বাবা-মাও আজ যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পেতেন না। তাঁর বাবা ছিলেন অদক্ষ শ্রমিক এবং মা ইংরেজি জানতেন না। জাভিদ স্পষ্টভাবে বলেন, অভিবাসন কমাতে হবে, ইংরেজি ভাষার শর্ত আরও কঠোর করতে হবে এবং কেবল দক্ষ কর্মীদেরই প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই বক্তব্যকে অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কঠোর নীতির বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।
জাভিদের অবস্থান ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একাধিক রাজনীতিকই ছিলেন সংখ্যালঘু পটভূমির। রক্ষণশীল সরকারের সময় সাজিদ জাভিদ, প্রীতি প্যাটেল, সুয়েলা ব্রাভারম্যান ও জেমস ক্লেভারলি এবং পরে লেবার সরকারের শাবানা মাহমুদ—সবার ক্ষেত্রেই অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
প্রীতি প্যাটেলের সময়ে পয়েন্টভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হয় এবং আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর বিতর্কিত পরিকল্পনা সামনে আসে। সুয়েলা ব্রাভারম্যান আরও কড়া ভাষায় অবৈধ অভিবাসন দমনের কথা বলেন। যদিও এই সময়কালে অভিবাসীর সংখ্যা বাস্তবে বেড়েছে, তবু সরকারের বার্তা ছিল স্পষ্ট—সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতার পেছনে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চেয়েও রাজনৈতিক কৌশল বড় ভূমিকা রাখে। অভিবাসন প্রশ্নটি যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই জাতি ও পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে যখন কড়াকড়ি নীতির মুখপাত্র হিসেবে সংখ্যালঘু রাজনীতিকদের সামনে আনা হয়, তখন বর্ণবাদী অভিযোগ এড়ানো তুলনামূলক সহজ হয়। সমালোচনাকে তখন জাতিগত নয়, বরং নীতিগত বিরোধ হিসেবে তুলে ধরা যায়।
এই কৌশল শুধু রক্ষণশীল দলেই সীমাবদ্ধ নেই। লেবার সরকার শাবানা মাহমুদকে স্বরাষ্ট্রসচিব করে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তিনি আশ্রয় ব্যবস্থা সংস্কারকে প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ঘোষিত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে আশ্রয় থেকে স্থায়ী বসবাসের পথ কঠিন করা, বহিষ্কার সহজ করতে আইন সংস্কার এবং প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা না করা দেশগুলোর জন্য ভিসা স্থগিত।
শাবানা মাহমুদের মতে, অভিবাসনের গতি ও পরিসর অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে অস্থিরতা ও বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করেছে। এই বক্তব্যে ডানপন্থীরা সন্তুষ্ট হলেও, লেবারের ভেতর ও সবুজ দল তাঁকে অভিবাসীদের দায়ী করার অভিযোগ তুলেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংখ্যালঘু রাজনীতিকদের কেবল প্রতীক হিসেবে দেখা ভুল হবে। অনেকেই ন্যায্যতা, আইনানুগতা ও অবদানের ভাষায় তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সাজিদ জাভিদ যেমন পারিবারিক অভিজ্ঞতার কথা বলেও বৈধ অভিবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন, তেমনি শাবানা মাহমুদ বলেছেন, নিয়ম মেনে আসা মানুষজন অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের কারণে বঞ্চিত বোধ করেন।
এই ভাষ্য অভিবাসন আলোচনাকে সরাসরি বর্ণবাদী ভাষা থেকে সরিয়ে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতির দীর্ঘদিনের জাতিগত বাস্তবতা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে অভিবাসন দমনে সংখ্যালঘু রাজনীতিকদের সামনে আসা কোনো বিস্ময় নয়। এটি দেখায় কীভাবে প্রতিনিধিত্বকে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই বৈধতা কতদিন সমাজের নৈতিক ও মানবিক সংকটকে আড়াল করে রাখতে পারবে। জাতি, সীমান্ত ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এখনো গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
















