আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশে অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটি এবার ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালটে থাকছে না, ফলে দলটির সমর্থক ও কর্মীদের মধ্যে হতাশা, ভীতি ও দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মধ্যাঞ্চলীয় রাজবাড়ী জেলার এক বাজারে জেলে রিপন মৃধা জানান, কিছুদিন আগেও এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাদের পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে ছিল দেয়াল। এখন সেসব চিহ্ন পুরোপুরি উধাও। ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর দলটি সব রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ হয় এবং হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযোগ ছিল, আন্দোলনের সময় এক হাজার চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যুর দায় তার সরকারের ওপর বর্তায়। এর পরই আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৭ কোটি মানুষের দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন। তবে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ সমর্থক রিপন মৃধা বলেন, দল নিষিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচনে তার আগ্রহ কমে গেছে। তবু ভোট না দিলে পরিচয় নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় পরিবারসহ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম, খুন, নির্যাতন ও দমন–পীড়নের স্মৃতি এখনো মানুষের ক্ষোভের কারণ। ফলে সাধারণ সমর্থকরাও নিরাপদ বোধ করছেন না।
শেখ হাসিনার সময়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়। জামায়াত নিষিদ্ধ হয়, শীর্ষ নেতাদের কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বিএনপির হাজারো নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন এবং তার ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন বিদেশে নির্বাসিত ছিলেন।
নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতাও অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা সাম্প্রতিক সময়ে নিহত হয়েছেন। তবে এবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরাও আগের মতো সুরক্ষা পাচ্ছেন না।
গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়া স্পষ্ট করে বলেন, ব্যালটে নৌকা না থাকলে তারা ভোট দেবেন না। তার মতে, নৌকা ছাড়া নির্বাচন মানে নির্বাচনই নয়।
ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন পরিত্যক্ত। আন্দোলনের সময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর ভবনটি আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। আশপাশের দোকানিরা জানান, প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের কেউ নিজেদের সমর্থক বলে পরিচয় দিচ্ছেন না।
তবে দলের ভেতরে একাংশ এখনো আশাবাদী। ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ কৌশলগত নীরবতায় আছে, কিন্তু রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে না। তার বিশ্বাস, দল আবার ফিরে আসবে এবং নেতৃত্বে থাকবেন শেখ হাসিনাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এ বিষয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, নির্বাচনের বাইরে থাকলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে মিশে যাবে। এতে নির্বাচন শেষে দলটির পক্ষে আগের অবস্থান পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান উত্থান আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের তুলনামূলক উদাহরণ হতে পারে। এক সময় নিষিদ্ধ ও দমন-পীড়নের শিকার হলেও জামায়াত টিকে আছে এবং এবার বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমে।
তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সক্রিয় সমর্থন নেমে এসেছে প্রায় ১১ শতাংশে। নির্বাচনী প্রচারে দলটির কোনো উপস্থিতি নেই। বরং নেতারা বিদেশ থেকে বক্তব্য ও কর্মসূচি দিচ্ছেন, যা সরকার ও জনমনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন গণতান্ত্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, অতীতের নির্বাচনী কারচুপি ও দমননীতির কারণে দলটি নিজের বৈধতা অনেকটাই হারিয়েছে। তবু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় দলগুলো খুব সহজে বিলুপ্ত হয় না।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আওয়ামী লীগ আপাতত অপেক্ষার কৌশল নেবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে দলটি আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় দলটি কার্যত রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রয়েছে।
রাজবাড়ীর জেলে রিপন মৃধার কণ্ঠে সেই অনিশ্চয়তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। তার ভাষায়, অতীতে আওয়ামী লীগ সংকটে পড়লেও এমন অবস্থা কখনো দেখেননি। এবার তার কাছে পুরো বিষয়টি এক ধরনের রাজনৈতিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো মনে হচ্ছে।
















