মিয়ানমারে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে চীন। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অবৈধ প্রতারণা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়, পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওয়েনঝৌয়ের একটি আদালত গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। বৃহস্পতিবার সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়।
কার্যকর হওয়া দণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড, গুরুতর জখম, অবৈধ আটক, প্রতারণা ও অবৈধ জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনার মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল। আদালতের মতে, ২০১৫ সাল থেকে সংঘটিত অপরাধগুলোর পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ ছিল যথেষ্ট ও নির্ভরযোগ্য।
নিহতদের মধ্যে তথাকথিত মিং পরিবার নামের একটি অপরাধচক্রের সদস্যও ছিলেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের কর্মকাণ্ডে অন্তত ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয় এবং আরও বহু মানুষ আহত হন।
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, দীর্ঘদিন ধরেই অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক বা কৃত্রিম মুদ্রায় বিনিয়োগের ফাঁদ পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে প্রতারিত করা হয়।
শুরুতে মূলত চীনা ভাষাভাষীদের লক্ষ্য করা হলেও পরবর্তীতে এসব চক্র একাধিক ভাষায় কার্যক্রম বিস্তার করে। প্রতারণায় যুক্তদের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় অংশ নিলেও, অনেক বিদেশিকে পাচার করে জোরপূর্বক এসব কেন্দ্রে কাজ করানো হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার হওয়ায় হাজার হাজার মানুষকে উদ্ধার করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। চীনের সর্বোচ্চ আদালত এই ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের সীমান্ত অঞ্চলে পরিচালিত এসব প্রতারণা চক্র থেকে বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চীনা নেতৃত্বাধীন অপরাধচক্র স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার দীর্ঘদিন এসব কেন্দ্রের বিষয়ে নীরব থাকলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চীনের চাপের মুখে অভিযান জোরদার করেছে। তবে পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এসব অভিযান আংশিকভাবে প্রচারণামূলক এবং প্রকৃত লাভবান চক্রগুলো পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
গত অক্টোবরে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী কুখ্যাত একটি প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। সেপ্টেম্বরের রায়ে আরও পাঁচজনকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২৩ জনকে পাঁচ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর আগেও নভেম্বরে মিয়ানমারের কোকাং অঞ্চলে পরিচালিত প্রতারণা চক্রে জড়িত থাকার দায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় চীন। ওই ঘটনায় ছয়জন চীনা নাগরিকের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারে অন্তত এক লাখ বিশ হাজার মানুষ অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য হতে পারে। কম্বোডিয়ায় এমন সংখ্যা প্রায় এক লাখ বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এ ধরনের কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে কম্বোডিয়ায় এসব প্রতারণা কার্যক্রম দ্রুত বেড়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যাসিনো ও হোটেলগুলোকে অবৈধ অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। এসব কেন্দ্রে হাজার হাজার কর্মী তথাকথিত অনলাইন প্রেম প্রতারণায় যুক্ত, যার মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ লুট করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তর সতর্ক করেছে, এই সাইবার প্রতারণা শিল্প এখন দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারভিত্তিক একাধিক প্রতারণা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
















