ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ, বলছেন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির গুরুত্ব বিবেচনায় সামরিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। সামরিক শক্তি বাড়লে বাংলাদেশের দিকে তাকানোর আগে ভারত অন্তত দুইবার ভাববে—এমন মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল।
পাকিস্তানের বিশিষ্ট নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ এখন তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সম্প্রতি পাকিস্তান সফররত বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইসলামাবাদে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ভারত বাংলাদেশের দিকে তাকানোর আগে অন্তত দুইবার ভাবতে বাধ্য হবে।
ইকরাম সেহগাল বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা অত্যন্ত নাজুক। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী সামরিক কাঠামো কেবল প্রতিরক্ষার বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়সহ সামরিক ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্ব বরাবরই দক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখে এসেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান সন্ত্রাসী তৎপরতার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব তৎপরতার পেছনে কারা জড়িত, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্ক প্রসঙ্গে ইকরাম সেহগাল বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘দুই দেশ এক জাতি’—এই ধারণা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে, যদিও তা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং।
তার মতে, এই ধারণা বাস্তবায়নের জন্য ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা, অবাধ বাণিজ্য চালু করা, শুল্কমুক্ত বাণিজ্য এবং আর্থিক লেনদেন সহজ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান জরুরি।
একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সে সময় যা ঘটেছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং ভয়াবহ। তবে ভবিষ্যতের পথে এগোতে হলে অতীতের বেদনাকে ধারণ করেই সামনে এগোতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের কষ্ট পাকিস্তানের জনগণকেও ভাগ করে নিতে হবে।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাবে।
সার্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের অসহযোগিতার কারণে আঞ্চলিক সংস্থাটি কার্যত অচল হয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সার্ককে কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে ভারতও তার ভুল বুঝতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে নিজের আবেগময় সম্পর্কের কথা তুলে ধরে ইকরাম সেহগাল বলেন, তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে আজকের বাংলাদেশের মাটিতে। কুমিল্লা, সিলেট ও ঢাকায় তার স্মৃতিবহ দিন কাটানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতি তার আবেগ ও দায়বদ্ধতা ব্যক্তিগত ও গভীর।
















