চীনের ইউনান প্রদেশের একটি হাসপাতালে প্রতি বছরই চিকিৎসকেরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকেন। বর্ষার মৌসুম এলেই সেখানে এমন অনেক রোগী আসেন, যারা দাবি করেন তারা অসংখ্য ক্ষুদ্র মানবাকৃতির অবয়ব দেখছেন। কেউ বলেন, তারা দরজার নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কেউ বলেন দেয়াল বেয়ে উঠছে, আবার কেউ বলেন আসবাবের গায়ে লেগে আছে। এই বিভ্রমের উৎস এক বিশেষ ধরনের ছত্রাক।
এই ছত্রাকের নাম লানমাওয়া এশিয়াটিকা। এটি সাধারণত পাইন গাছের সঙ্গে সহাবস্থানে জন্মায় এবং ইউনান অঞ্চলে এটি বেশ জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছত্রাকের মৌসুমে বাজার, রেস্তোরাঁ ও ঘরোয়া খাবারে এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। তবে এটি ভালোভাবে রান্না না করলে খেলে ভয়ংকর বিভ্রম শুরু হয়।
স্থানীয় সংস্কৃতিতে বিষয়টি এতটাই পরিচিত যে রেস্তোরাঁয় পরিবেশনের সময় পর্যন্ত সতর্কতা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে এই ছত্রাক খেতে মানা করা হয়, কারণ কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ অবস্থায় খেলে মানুষ নাকি ‘ছোট মানুষ’ দেখতে শুরু করে।
ইউনানের বাইরে এই ছত্রাকটি দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের কাছেও ছিল রহস্য। বহু বছর ধরে লোককথা ও বিচ্ছিন্ন বর্ণনা থাকলেও সঠিক প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকেরা এই ছত্রাকের বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত করেন।
১৯৯১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউনানের কয়েকজন রোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যারা এই ছত্রাক খাওয়ার পর তথাকথিত ‘লিলিপুটিয়ান বিভ্রমে’ আক্রান্ত হন। এই বিভ্রমে মানুষ ক্ষুদ্র আকৃতির মানুষ বা কল্পিত প্রাণী দেখতে পান। রোগীরা জানান, পোশাক পরার সময় কিংবা খাবারের সময় থালার ওপরও তারা এই ক্ষুদ্র অবয়বগুলো দেখতে পেতেন। চোখ বন্ধ করলে বিভ্রম আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত।
এরও আগে, গত শতকের ষাটের দশকে পাপুয়া নিউগিনিতে অনুরূপ ঘটনার সন্ধান পেয়েছিলেন কয়েকজন গবেষক। সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে এক ধরনের ছত্রাক খেলে মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয় বলে জানা গিয়েছিল। তখন নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পরও কোনো পরিচিত রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করা যায়নি, ফলে বিষয়টি লোককথা হিসেবেই উপেক্ষিত থেকে যায়।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো লানমাওয়া এশিয়াটিকা নাম দিয়ে এই ছত্রাককে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর সাম্প্রতিক গবেষণায় এর রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চলছে। ইউনান ও ফিলিপাইনে সংগৃহীত নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চেহারায় কিছু পার্থক্য থাকলেও এগুলো একই প্রজাতির ছত্রাক।
গবেষণায় আরও জানা গেছে, এই ছত্রাকের বিভ্রম সৃষ্টিকারী উপাদানটি পরিচিত কোনো সাইকেডেলিক রাসায়নিক নয়। এর প্রভাব সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রম, বিভ্রান্তি ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ছত্রাক খেলে প্রায় সবাই একই ধরনের বিভ্রমের কথা বলেন। অন্য অনেক বিভ্রম সৃষ্টিকারী পদার্থে অভিজ্ঞতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হলেও এখানে ‘ক্ষুদ্র মানুষ দেখার’ অভিজ্ঞতা বারবার ও নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যায়।
গবেষকেরা মনে করেন, এই ছত্রাক নিয়ে গবেষণা মানব মস্তিষ্ক ও চেতনার কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে যেসব মানুষ কোনো ছত্রাক না খেয়েও এই ধরনের বিভ্রমে ভোগেন, তাদের চিকিৎসার পথও খুলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর ছত্রাক জগতের মাত্র অল্প অংশই এখনো চিহ্নিত করা গেছে। এই রহস্যময় ছত্রাক নতুন ওষুধ আবিষ্কার এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতির এই বিশাল অজানা ভাণ্ডারে এখনো অসংখ্য আবিষ্কার অপেক্ষা করে আছে।
















