বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজস্ব ইন্টারনেট, সার্চ ইঞ্জিন ও মেসেজিং অ্যাপ চালু করতে যাচ্ছে খামেনি প্রশাসন। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা কেবল বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্তদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বিশ্বের সাথে যোগাযোগের মূল সেতুবন্ধন বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে নিজেদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। বিশ্বকে পাশ কাটিয়ে এবার নিজস্ব প্রযুক্তির ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এই নতুন ব্যবস্থায় থাকবে আলাদা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, নিজস্ব উদ্ভাবিত সার্চ ইঞ্জিন, এমনকি মেসেজিং অ্যাপও—যার সবটুকুই থাকবে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হবে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফিল্টারওয়াচ’-এর বরাতে আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মূলত গত ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে সরকারবিরোধী জনরোষে রূপ নিলে বিপাকে পড়ে ইরান সরকার। অভিযোগ ওঠে, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের উসকানি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরই প্রেক্ষিতে গত ৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় খামেনি প্রশাসন। বিক্ষোভকারীরা বিকল্প হিসেবে এলন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ ব্যবহার করে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করলেও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটিও অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হয় তেহরান। এই অভিজ্ঞতার আলোকেই দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নিজস্ব ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা ফিল্টারওয়াচ জানিয়েছে, ইরানের এই জাতীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ও ন্যাভিগেশন সেবা। এমনকি নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবের বিকল্প হিসেবে ইরানের নিজস্ব স্ট্রিমিং সাইট আনারও পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই ঠিক করে দেবে একজন নাগরিক ইন্টারনেটে কী দেখবেন বা কার সাথে কথা বলবেন। তবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে কেবল নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত বা সরকারি যাচাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য। সাধারণ নাগরিকদের জন্য কেবল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় সার্ভারের মাধ্যমে এই ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ সেবাটি উন্মুক্ত থাকবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ দিনে টানা ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুরোদস্তুর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান। পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নেটব্লকস’ এই শাটডাউনকে বিশ্বে সরকার নিয়ন্ত্রিত দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশটিতে কার্যকর কোনো বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ নেই বললেই চলে। বিশ্লেষকদের মতে, নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু হলে ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো একটি বদ্ধ ডিজিটাল সমাজে পরিণত হতে পারে, যা দেশটির মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হানবে।
















