একই দিনে দ্বৈত ভোট নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি; প্রচারণায় দলগুলোর অনীহা ও বৈষম্যের অভিযোগ
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর তাদের রায় দেবেন। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের প্রচারণায় উৎসবের আমেজ থাকলেও ‘গণভোট’ নিয়ে জনমনে কাজ করছে গভীর ধোঁয়াশা। সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশই জানেন না ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের প্রকৃত গুরুত্ব কিংবা সংস্কার প্রস্তাবগুলো আসলে কী। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রচারণায় অনীহা দেখা গেলেও জামায়াতে ইসলামী ও নাগরিক পার্টির মতো দলগুলো একে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় আছে মাত্র চার সপ্তাহ। চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এখন ভোটের আলাপ। তবে এই আলাপে সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ যতটা, গণভোট নিয়ে নীরবতা ততটাই স্পষ্ট।
জনমনে বিভ্রান্তি: ‘গণভোট কেন দেবো, বুঝি না’
সিলেট থেকে রাজশাহী কিংবা বরিশাল—সর্বত্র সাধারণ ভোটারদের কণ্ঠে একই বিভ্রান্তি। সিলেটের কৃষক আজিজুর রহমানের প্রশ্ন, “সংসদ ভোট তো চিনি, কিন্তু গণভোটটা কেন দেবো সেটাই তো বুঝি না।” অন্যদিকে, রাজশাহীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা মনে করছেন, মানুষ যদি সংস্কারের সুফল সম্পর্কে না জানে, তবে এই বিশাল আয়োজনের সার্থকতা কোথায়? অনেক ভোটার দুই ব্যালটে আলাদাভাবে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও সন্দিহান।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রচারণার কৌশল
গণভোটের প্রচার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে: ১. সরব যারা: জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। ২. নীরব বা কৌশলী যারা: বিএনপি ও এর শরিক দলগুলো। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট জানিয়েছেন, গণভোটের প্রচারণার দায়িত্ব বিএনপির নয়। তবে ঢাকা-৮ আসনে আফরোজা আব্বাসের মতো অনেক নেতা সামাজিক মাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে ব্যক্তিগত প্রচারণা চালাচ্ছেন। ৩. সংশয়বাদী যারা: বাম দলগুলোর একটি অংশ বলছে, গণভোটের অনেক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ এবং এখানে সব নাগরিকের মতামতের প্রতিফলন ঘটার সুযোগ কম।
ঢাকার চিত্র: প্রার্থীরা ব্যস্ত কেবল ‘নিজের বৈতরণী’ পার হতে
রাজধানীর ২০টি আসনে প্রার্থীরা দিনরাত এক করে ফেললেও ‘গণভোট’ তাঁদের কাছে ব্রাত্য। হেভিওয়েট প্রার্থীরা কেবল নিজ নিজ প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন। ব্যতিক্রম শুধু ঢাকা-৯ আসনের জাবেদ রাসিন, যিনি লিফলেটের এক পাশে নিজের প্রতীক ‘শাপলা কলি’ ও অন্যপাশে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।
সরকারের বক্তব্য: ‘রাতের ভোট’ বন্ধের পথরেখা
গণভোট প্রচারের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, এবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দেশে চিরতরে ‘রাতের ভোট’ ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পথ বন্ধ হবে। এটি কেবল একটি ভোট নয়, বরং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তার পথরেখা। সরকার ‘ভোটের গাড়ি’ ও বিভাগীয় কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করলেও তা এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ—একজন প্রতিনিধি নির্বাচন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলোকে অনুমোদন দেওয়া। এই দ্বৈত পরীক্ষায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সচেতনতাই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের গতিপথ।
















