বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের কাছে নিজস্বভাবে উৎপাদিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির উদ্যোগ জোরদার করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তান ও ভারতের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর দেশটির প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন গতি আসায় এই যুদ্ধবিমান ঘিরে আগ্রহও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নতুন বছরের শুরুতেই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকের পর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর জানায়, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং একটি চুক্তি শিগগিরই হতে পারে।
আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরের পুরোনো যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে পাকিস্তানের সহযোগিতা চেয়েছেন হাসান মাহমুদ খান। একই সঙ্গে দ্রুতগতিতে সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং জেএফ-১৭ সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
সুপার মুশশাক একটি হালকা ওজনের প্রশিক্ষণ বিমান, যা দুই থেকে তিন আসনবিশিষ্ট এবং মূলত পাইলট প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান, ইরাকসহ একাধিক দেশে এই বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর একদিন পর রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এ ছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে লিবিয়ার একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তির খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে এক ডজনের বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান সরবরাহের কথা রয়েছে। যদিও এসব চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নিশ্চিত করেনি পাকিস্তান।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের আকাশযুদ্ধ জেএফ-১৭-এর প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ওই সংঘর্ষে পাকিস্তান দাবি করে, তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। পরে ভারতীয় কর্মকর্তারাও ক্ষতির কথা স্বীকার করেন, যদিও নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, তুলনামূলক কম দামের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতার কারণে জেএফ-১৭ অনেক দেশের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের দাম আনুমানিক ২ কোটি ৫০ থেকে ৩ কোটি মার্কিন ডলার, যা ফরাসি রাফাল বা ইউরোপীয় গ্রিপেনের তুলনায় অনেক কম।
জেএফ-১৭ একটি হালকা, সব আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য, বহু-ভূমিকায় সক্ষম যুদ্ধবিমান, যা পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন যৌথভাবে তৈরি করেছে। এর সর্বাধুনিক ব্লক-৩ সংস্করণে উন্নত এভিওনিক্স, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং এএসইএ রাডার রয়েছে, যা একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও আঘাত হানতে পারে।
এ পর্যন্ত মিয়ানমার, নাইজেরিয়া ও আজারবাইজান জেএফ-১৭ কিনেছে। আরও কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখালেও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। তবে পাকিস্তান আশা করছে, সাম্প্রতিক সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন বাজার খুলবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। জেএফ-১৭ বা সুপার মুশশাক কেনা শুধু অস্ত্র ক্রয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কৌশলগত সহযোগিতার ইঙ্গিত বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিমান কেনা মানে তিন থেকে চার দশকের একটি প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার। সে কারণে বাংলাদেশসহ যেসব দেশ জেএফ-১৭ নিয়ে ভাবছে, তারা ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানও বিবেচনায় নিচ্ছে।
















