লেবাননের সরকার ও সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের প্রথম ধাপ শেষ করার দাবি করতে যাচ্ছে, তবে দেশীয় ও আঞ্চলিক জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সেনাপ্রধান রোদলফ হাইকাল ৮ জানুয়ারি সরকারকে এই অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করবেন বলে জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে লেবানন সেনাবাহিনী সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের দক্ষিণ সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যায়, যেখানে হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলার কাজ কতদূর এগিয়েছে তা দেখানো হয়। ওই সময় ইসরায়েল হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হলে হামলা আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছিল।
সেনাবাহিনীর নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার প্রথম ধাপ শেষ করা। এই ধাপে লিতানি নদী থেকে ইসরায়েল সীমান্ত পর্যন্ত এলাকা পরিষ্কার করার কথা রয়েছে। সেনাপ্রধান হাইকাল জানিয়েছেন, সীমিত সক্ষমতা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী আন্তরিকভাবে এই দায়িত্ব পালন করছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান ও দখলদারিত্ব এই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
ইসরায়েল দাবি করছে, সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় হিজবুল্লাহ এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং সেনাবাহিনীর চেয়ে দ্রুত গতিতে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে। তবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ নতুন করে অবকাঠামো গড়ে তুলছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি।
সরকারি বৈঠকের আগেই ইসরায়েল উত্তর লিতানি এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে, যা পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েল সেনাবাহিনীর পরবর্তী ধাপের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধাপকে লক্ষ্য করে এগোচ্ছে, যা লেবানন সেনাবাহিনীর জন্য আরও কঠিন হবে।
দ্বিতীয় ধাপে লিতানি নদীর উত্তর দিক থেকে সাইদন শহরের উত্তরের আওয়ালি নদী পর্যন্ত অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছে, লিতানির উত্তরে তারা কোনো নিরস্ত্রীকরণ মানবে না। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিজবুল্লাহ এই নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনা হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি কেবল লিতানির দক্ষিণে প্রযোজ্য। অন্যদিকে, লেবাননের সমালোচকদের মতে, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৭০১ বাস্তবায়ন করা জরুরি, যেখানে সারা দেশে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হয়েছে।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লিতানির উত্তরে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা হলে শিয়া সম্প্রদায়ের বড় অংশ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তাদের ধারণা, একদিকে ইসরায়েলের হুমকি, অন্যদিকে সিরিয়ায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই দুই চাপের কারণে শিয়া জনগোষ্ঠী এখনো হিজবুল্লাহর অস্ত্রকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখছে।
লেবানন সরকার পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলেও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এগোনোর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেছেন, সরকার সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে যেতে প্রস্তুত, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এমন এক সময়েই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৈরুত সফরে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর ও সেনাবাহিনীর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সূচির মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। কারণ হিজবুল্লাহ ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র, এবং তেহরান যে কোনো মূল্যে তাদের অস্ত্র হারানো ঠেকাতে চেষ্টা করবে।















