নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার; সংকটে গৃহস্থালি ও রেস্তোরাঁ
সারাদেশে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে তীব্র সংকট ও দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। সরকারিভাবে জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে তা ১,৮০০ থেকে ২,২০০ টাকা, এমনকি কোথাও কোথাও ২,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংকটের কারণ হিসেবে আমদানিকারকরা জাহাজ সংকট ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দোহাই দিলেও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে—এটি মূলত খুচরা ব্যবসায়ীদের তৈরি একটি ‘কৃত্রিম সংকট’। অসাধু সিন্ডিকেট চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে কয়েক কোটি গ্রাহক।
গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজধানীসহ সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারের হাহাকার চলছে। টাকা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস, আর যেখানে মিলছে সেখানে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দাম।
সংকটের মূলে আমদানির জাহাজ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব (LOAB) এবং বিইআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, এবারের সংকটের পেছনে বেশ কিছু কারিগরি ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ রয়েছে:
- জাহাজ সংকট: এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি আন্তর্জাতিক জাহাজ বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় আমদানিতে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটছে।
- আমদানি হ্রাস: গত বছরের নভেম্বরে যেখানে ১ লাখ ৮০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, এ বছর একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টনে।
- শীতকালীন চাহিদা: শীতের মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা ও দাম এমনিতেই চড়া থাকে, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও।
‘কৃত্রিম সংকট’ ও সিন্ডিকেট চক্র
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দাবি, বাজারে বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও একটি অসাধু চক্র বিইআরসি’র নতুন দাম ঘোষণার আগেই মজুদ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
- ব্যবসায়ীদের কারসাজি: অনেক খুচরা বিক্রেতা ক্যামেরার সামনে ১,৫০০ টাকা দাম বললেও অন্তরালে ২,২০০ টাকার নিচে গ্যাস দিচ্ছেন না।
- বড় কোম্পানিগুলোর ভূমিকা: বেক্সিমকো, বসুন্ধরা ও ইউনিটেক্সের মতো বড় সরবরাহকারীরা এলসি জটিলতা ও অন্যান্য কারণে সাময়িকভাবে আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও হুঁশিয়ারি
বাজারের এই অস্থিতিশীলতা নিরসনে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ১. ভ্রাম্যমাণ আদালত: জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অসাধু মজুদদারদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য। ২. ভোক্তা অধিকারের পরামর্শ: নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিলে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ৩. বিইআরসি’র ঘোষণা: গতকাল (৪ জানুয়ারি) ১২ কেজি এলপিজির দাম ১,২৫৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৩০৬ টাকা করা হয়েছে, তবে ভোক্তা পর্যায়ে এই মূল্যের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রাহকের ভোগান্তি
রাজধানীর মালিবাগ, কেরানীগঞ্জ ও মানিকনগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। গৃহিণী ও ছোট রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকটের পর এখন সিলিন্ডার গ্যাসের এই আগুন দামে তারা দিশেহারা। এই সমস্যা সমাধানে আরও অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















