২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিস্তার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ভূখণ্ডে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলার ঘটনা ঘটল, যা চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সামরিক অভিযানের তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেছে।
ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ভেনেজুয়েলার একটি ডক এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই স্থাপনায় মাদক বহনকারী নৌযানগুলো পণ্য তোলার কাজ করত। হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরলেও এবং এ বছর বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকার দাবি করলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি জানায়, ২০ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বা অংশীদার হিসেবে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে মোট ৬২২টি হামলায় যুক্ত ছিল।
এই হামলাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র মোট সাতটি দেশে সামরিক হামলা চালিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী মাদক পাচারবিরোধী অভিযানের অংশ। এর আগে ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলাসংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন নৌযানে একাধিক হামলা চালানো হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব নৌযান হামলায় অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও উঠেছে।
নাইজেরিয়া
২৫ ডিসেম্বর নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো সরাসরি সামরিক হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আইএস সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। নাইজেরিয়া সরকার অভিযানের সাফল্যের কথা বললেও হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
সোমালিয়া
সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। তবে ২০২৫ সালে দেশটিতে মার্কিন বিমান হামলার সংখ্যা আগের সব প্রশাসনের তুলনায় বেশি হয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের অভিযোগও উঠেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সে বিষয়ে কোনো সংখ্যা জানায়নি।
সিরিয়া
ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আইএসের অবস্থানে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। সিরিয়াজুড়ে একাধিক অস্ত্রভাণ্ডার ও স্থাপনা ধ্বংসের কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইরান
জুন মাসে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে। এর জবাবে ইরান কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতীকী হামলা চালালেও বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো হয় এবং পরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
ইয়েমেন
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ধারাবাহিক বিমান ও নৌ হামলা চালায়। এসব হামলায় বহু বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ওমানের মধ্যস্থতায় মে মাসে একটি সমঝোতার মাধ্যমে এই অভিযান স্থগিত হয়।
ইরাক
মার্চ মাসে ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে মার্কিন হামলায় আইএসের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতাসহ দুই সদস্য নিহত হন বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে। এই অভিযানে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতার কথাও জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক তৎপরতা একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার কৌশল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো হস্তক্ষেপমূলক নীতির পুনরাবৃত্তি। যদিও ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সামরিক অভিযানের পরিধি এখনও বিস্তৃত।
















