লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের প্রথম ধাপ শেষ করার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৫ সালের শেষের দিকে এসে পৌঁছালেও সংগঠনটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা অস্ত্র ছাড়বে না। এমন অবস্থায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন লেবাননকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গত আগস্টে লেবাননের মন্ত্রিসভা সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পনার আলোকে ২০২৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে হিজবুল্লাহর অস্ত্র অপসারণের রূপরেখা তৈরি করতে। সেপ্টেম্বর মাসে সেনাবাহিনী একটি ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, যার প্রথম পর্যায়ে লিতানি নদী পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননকে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বৈরুতসহ পুরো দেশে এই প্রক্রিয়া সম্প্রসারণের কথা বলা হয়।
তবে হিজবুল্লাহ শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। সংগঠনটি একে ‘মারাত্মক অপরাধ’ বলে অভিহিত করে জানায়, তারা এই নির্দেশনাকে অস্তিত্বহীন বলেই বিবেচনা করবে। হিজবুল্লাহর ভাষ্য, এমন এক সময়ে নিরস্ত্রীকরণের দাবি তোলা হচ্ছে, যখন ইসরায়েল নিয়মিতভাবে লেবাননে বিমান হামলা চালাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম সম্প্রতি বলেন, ইসরায়েলি আগ্রাসন চলাকালে শুধু রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র রাখার দাবি তোলা মানে লেবাননের স্বার্থ নয়, বরং ইসরায়েলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করা।
এই বিতর্কের মধ্যেই ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ লেবাননের একাধিক গ্রামে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী মারওয়াহিন শহরে শেষ অক্ষত বাড়িটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। লিতানি নদীর উত্তরের এলাকাতেও হামলা হয়েছে। নভেম্বরে বৈরুতে এক হামলায় হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার হাইসম তাবতাবাই নিহত হন। গত সপ্তাহে সাইদন শহরে এক ইসরায়েলি হামলায় তিনজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন লেবাননের সেনা কর্মকর্তা ছিলেন।
ইসরায়েল এখনো লেবাননের ভেতরে পাঁচটি এলাকা দখল করে রেখেছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে পুনর্গঠন কার্যক্রমেও বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত নজরদারি ড্রোনের শব্দে বৈরুতসহ বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
হিজবুল্লাহর অবস্থান হলো, ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে তারা লেবাননের জন্য একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, যেখানে তাদের অস্ত্রের ভূমিকা নির্ধারিত হতে পারে।
হিজবুল্লাহবিরোধীরা বলছেন, সংগঠনটির অস্ত্র ইসরায়েলকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং এসব অস্ত্র আরও হামলার অজুহাত তৈরি করছে। তাদের মতে, একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত থাকার সুযোগ নেই। তারা ইরানের সঙ্গে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা করে বলছেন, সংগঠনটি লেবাননের চেয়ে তেহরানের স্বার্থ বেশি রক্ষা করছে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সমর্থকদের যুক্তি, তাদের প্রতিরোধ শক্তি না থাকলে দুর্বল লেবানন সেনাবাহিনীর পক্ষে ইসরায়েলের আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব হতো না এবং দক্ষিণ লেবানন দখলের ঝুঁকি থেকেই যেত।
লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালে ইরানের সহায়তায় গঠিত হিজবুল্লাহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ২০০৬ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই চালায়।
তবে গত বছর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সীমান্তে সংঘাতে জড়ানো হিজবুল্লাহ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইসরায়েল দেশজুড়ে বড় আকারের অভিযান চালিয়ে সংগঠনটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের অনেককে হত্যা করে, যার মধ্যে দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহও ছিলেন। এই সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
যুদ্ধ শেষে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েল তা লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হিজবুল্লাহ এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের পাল্টা হামলা থেকে বিরত রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে লেবাননের সামনে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সরকার যদি শক্তি প্রয়োগ করে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করে, তাহলে তা গৃহসংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। সেনাবাহিনীর ভেতরেও বিভক্তি দেখা দিতে পারে, কারণ অনেক সদস্য হিজবুল্লাহকে নিজেদের জনগণের অংশ হিসেবে দেখেন।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যে লেবানন ও হিজবুল্লাহ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সহজ কোনো সমাধান চোখে পড়ছে না।
















