অর্থকেন্দ্রিক প্রতারণায় বাড়ছে ভুক্তভোগী, নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় দুই লাখ অভিযোগ জমা পড়েছে; চলতি বছরেই ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেশের সাইবার অপরাধ পরিস্থিতি। বাড়ছে অভিযোগ, বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ অভিযোগ করেছেন। শুধু চলতি বছরেই গোয়েন্দা পুলিশের হাতে জমা পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার অভিযোগ, যার অধিকাংশই আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সাইবার অপরাধ কমাতে জনগণের সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ জন সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছেন। গত ছয় মাসে সাইবার পুলিশ সেন্টারে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগী। এর মধ্যে অনলাইন আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৮১৩ জন, ই-কমার্স প্রতারণার শিকার ৭৪৩ জন এবং বিনিয়োগ ফাঁদে পড়েছেন ৫৪৪ জন।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, সাইবার চক্রগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও কৌশলী। তারা প্রথমে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনের কল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস পরিবর্তন করে, এরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাসওয়ার্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে মামলা থেকে রক্ষা বা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়েও টাকা আদায় করা হচ্ছে।
সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের আইনি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫৫২ জনকে সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, বার্তা, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে অপরাধের শিকার হয়েছেন ৮০২ জন। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ২৮২টি, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার ১৮৭ জন এবং সিম ক্লোনিংয়ের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৬৫ জনের ক্ষেত্রে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার হামলার প্রধান লক্ষ্য এখন অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধ আরও জটিল আকার নিতে পারে।
জরিপ অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী। তবে ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ সামাজিক ও মানসিক চাপে আইনের আশ্রয় নিতে অনাগ্রহী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা জোরদার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
















