থাইল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ মেটাতে আলোচনা চললেও তার মাঝেই প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে নির্মম সামরিক হামলার অভিযোগ তুলেছে কাম্বোডিয়া। দেশটির দাবি, আলোচনার আড়ালে থাই বাহিনী আকাশপথে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালিয়ে সীমান্ত এলাকার জনজীবনকে তছনছ করে দিয়েছে।
কাম্বোডিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, শুক্রবার ভোরে থাই যুদ্ধবিমান উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী গ্রাম চৌক চেয়ের আশপাশে একের পর এক বোমা নিক্ষেপ করে। এতে বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই হামলাকে সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ভয়ংকর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একই দিনের সকালে সীমান্তের কাছের স্টাং বট এলাকায় থাই বাহিনীর গোলাবর্ষণের খবরও জানায় কাম্বোডিয়ার সংবাদ সংস্থা আগঁস কাম্পুচিয়া প্রেস। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এসব হামলা ছিল পরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর, যা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে আবারও সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সীমান্তজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে। ৮ ডিসেম্বর নতুন করে লড়াই শুরুর পর ভেঙে পড়ে অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় হওয়া সম্প্রসারিত যুদ্ধবিরতি। চলতি মাসের সংঘাতে উভয় পক্ষের হিসাবে অন্তত ৯৬ জন নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
এই উত্তেজনার মধ্যেই বুধবার থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেন। তবে সেই বৈঠক থেকে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি আসেনি। কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মালি সোচেতা জানান, শুক্রবার দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত কমিটির অধীনে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর আশা, নতুন করে সংলাপ শুরু হলে যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল হবে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষজন আবার ঘরে ফিরতে পারবে।
থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার এই বিরোধের মূল রয়েছে উপনিবেশ আমলের সীমান্ত নির্ধারণ এবং প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে। নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর দুই দেশই একে অপরকে দায়ী করছে এবং আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং নতুন করে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেয়। কাম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের সঙ্গে ফোনালাপে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং কুয়ালালামপুর শান্তি চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
রাশিয়াও দুই দেশকে সংযম দেখিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটানোর পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সীমান্তের গ্রামগুলোতে ধোঁয়ার গন্ধ আর উদ্বাস্তু শিবিরে পানির জন্য অপেক্ষমাণ শিশুদের চোখে যে আতঙ্ক জমে আছে, তা যেন এখনো শান্তির প্রতিশ্রুতিকে ছাপিয়ে বাস্তবের কঠিন সত্য হয়ে রয়ে গেছে।
















