মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাঁচজন ইউরোপীয় নাগরিকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মতামত দমন ও সেন্সর করার জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর হয়ে এমন কার্যক্রম চালিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও কোম্পানির মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়। তিনি তাদের ‘চরমপন্থী কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে কিছু আদর্শবাদী গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজেদের অপছন্দের মত দমন করতে বাধ্য করছে। ট্রাম্প প্রশাসন আর এ ধরনের সীমান্তের বাইরে গিয়ে সেন্সরশিপের প্রচেষ্টা মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভিসা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিশনার থিয়েরি ব্রেতোঁ। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইইউর অভ্যন্তরীণ বাজার বিষয়ক কমিশনার ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনকূটনীতি বিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি সারা রজার্স দাবি করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট প্রণয়নে ব্রেতোঁ মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। এই আইন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলার জন্য করা হয়েছে। রজার্সের অভিযোগ, এই আইন ব্যবহার করে ব্রেতোঁ একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ককে চাপ দিয়েছিলেন, বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের আগে।
ভিসা নিষেধাজ্ঞার জবাবে ব্রেতোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘ডাইনি খোঁজার অভিযান’ বলে আখ্যা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকার্থি যুগের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, সেন্সরশিপ কোথায় হচ্ছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ভুল।
এ ছাড়া যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তারা হলেন কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী ইমরান আহমেদ, জার্মান সংগঠন হেটএইডের দুই নেতা জোসেফিন ব্যালন ও আন্না-লেনা ফন হোডেনবার্গ এবং গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের প্রধান ক্লেয়ার মেলফোর্ড।
ফ্রান্সের ইউরোপ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ইউরোপের ডিজিটাল নীতিমালা অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। তাঁর মতে, ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইউরোপে গৃহীত হয়েছে এবং এর কোনো অতিরাষ্ট্রীয় প্রভাব নেই, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
হেটএইডের দুই নেতাও এক বিবৃতিতে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা ইউরোপে কার্যকর আইন বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার চেষ্টা। তারা দাবি করেন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াদের চুপ করাতে সেন্সরশিপের অভিযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের একজন মুখপাত্র এই পদক্ষেপকে অনৈতিক ও বেআইনি আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কর্তৃত্ববাদী আক্রমণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়াবে। বিশেষ করে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টকে ঘিরে দুই পক্ষের মতবিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মহল আইনটিকে ডানপন্থী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে দেখালেও ব্রাসেলস সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই আইনে বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে কনটেন্ট অপসারণের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা, ব্যবহারকারীদের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গবেষকদের তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সম্প্রতি এই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইলন মাস্কের এক্সকে জরিমানাও করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
















