সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ছন্দপতন ঘটেছে এবং বড় অঙ্কের পুঁজি পাচারের ফলে আর্থিক খাতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক খাত ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া কঠিন।
দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৮৮ শতাংশই ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীভূত। তবে দীর্ঘদিনের দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব খাটানো এবং ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার প্রবণতায় ব্যাংক খাতের কার্যকারিতা ও আর্থিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কঠোর তদারকির বদলে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে উৎসাহিত করেছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত করেছে। এর ফলে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গ্রহণ এবং তদারকি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংক খাতে অনিয়মজনিত সম্ভাব্য দাবির পরিমাণ বিবেচনায় একটি সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের ৩৬ শতাংশে পৌঁছায় এবং একই বছরের জুনে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন অনুপাত নেমে আসে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা নির্ধারিত ন্যূনতম মানের অর্ধেকেরও কম। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তীব্র মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে, ফলে পুনর্গঠন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, নির্দেশিত ঋণ ও নীরব রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মতো হস্তক্ষেপ বাজারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে, যা সরকারি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে। ইতোমধ্যে সরকারি ঋণের বড় অংশ দেশীয় ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে এবং আগামী অর্থবছরেও সরকারের উল্লেখযোগ্য ঋণ ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিলম্বিত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ব্যয় ও ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সময়সীমা নির্ধারণ করে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে দেউলিয়াত্ব আইন শক্তিশালী করা ও খেলাপি ঋণের জন্য দ্বিতীয় বাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও অগ্রগতি থমকে গেছে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র অর্ধেকের একটু বেশি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল আর্থিক সেবার আওতায় রয়েছে এবং নারী-পুরুষের ব্যবধান বিশ্বে অন্যতম বেশি। ব্যবসা খাতের জন্যও অর্থায়নের সুযোগ সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা না ফিরলে অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ সফল হবে না।
ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ, মোবাইল ওয়ালেটের ব্যবহার সহজ করা, ফি ও মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ঋণতথ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই খাতে নতুন গতি আনা সম্ভব বলে মত দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা কেবল একটি কারিগরি লক্ষ্য নয়, এটি এমন এক ভিত্তি যার ওপর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়ে থাকে। শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
















