আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রত্যাখ্যাতদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেসব দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন কমানো এবং প্রত্যাখ্যাতদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বাংলাদেশসহ সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ উৎস দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে।
ইইউর ঘোষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, কলম্বিয়া, মিশর, কসোভো, ভারত, মরক্কো ও টিউনিশিয়া—এই সাত দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। এর ফলে বিশেষ কারণ ছাড়া এসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
ইইউর নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং যেসব দেশ ভবিষ্যতে ইইউ সদস্যপদপ্রার্থী—সেসব দেশকেও ‘নিরাপদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এ তালিকায় আলবেনিয়া, মন্টেনেগ্রো ও তুরস্কের নাম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো দেশে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হলে বা ইইউ যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সে ক্ষেত্রে ওই দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে গণ্য করা হবে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো দেশে নির্বিচার সহিংসতা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকলে তাকে নিরাপদ বলা যাবে না।
‘নিরাপদ’ দেশগুলোর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে ইউরোপীয় কমিশন। পরিস্থিতির অবনতি হলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিরাপদ মর্যাদা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে নিরাপদ দেশের তালিকা আরও সম্প্রসারণের সুযোগও রাখা হয়েছে।
ইইউ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এসব দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন ঢালাওভাবে বাতিল করা যাবে না। প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে। তবে সদস্য দেশগুলো দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির অধিকার পাবে, যার ফলে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ বাস্তবে সীমিত হয়ে যাবে।
২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে এক কোটির বেশি মানুষ ইউরোপে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে ইইউজুড়ে অভিবাসন সংকট তৈরি হয়। এর পর থেকেই আশ্রয়নীতি নিয়ে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির পর ২০২৪ সালে ইইউ একটি অভিন্ন আশ্রয়নীতি চূড়ান্ত করে, যা আগামী বছরের জুনে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এই নীতির আওতায় ‘নিরাপদ দেশ’ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে যেসব দেশে ফেরত পাঠালে শারীরিক নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে কাউকে ফেরত পাঠানো যাবে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনা
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল–এর ইইউবিষয়ক পরামর্শক অলিভিয়া সান্ডবার্গ দিয়েজ বলেন, ইইউর এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং এতে অভিবাসীরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের ইইউ পরিচালক সেলিন মিয়াস জানান, আশ্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির এই উদ্যোগ প্রকৃত ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হবে। বিশেষ করে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, ইতালির ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য আলেসান্দ্রো সিরিয়ানি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইইউ তার সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর বার্তা দিয়েছে এবং সদস্য দেশগুলোর জন্য অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন।















