ঢাকায় তরুণ আন্দোলন নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় দেশের দুটি শীর্ষ সংবাদপত্রের কার্যালয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের সময় ভেতরে আটকে পড়া সাংবাদিক ও কর্মীরা জানান, তারা দীর্ঘ সময় শ্বাস নিতে না পেরে মৃত্যুভয়ে ছিলেন।
গত সপ্তাহে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বৃহস্পতিবার রাতে শত শত বিক্ষোভকারী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার ও বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালানো হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই সহিংসতা পরদিনও ছড়িয়ে পড়ে।
ডেইলি স্টার এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অন্যতম অন্ধকার দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটির পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ জানান, ৩৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম ডেইলি স্টার ছাপা সংস্করণ প্রকাশ করতে পারেনি এবং কার্যালয় কিছু সময়ের জন্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, হামলার সময় ভবনের ছাদে অন্তত ২৮ জন কর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ধোঁয়া ও আগুনের কারণে তারা তাজা বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছিলেন। পরে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা পৌঁছালে তাদের উদ্ধার করা হয়।
কেউ গুরুতর আহত না হলেও ভবনের বড় অংশ পুড়ে গেছে। শুক্রবার বিবিসি বাংলার প্রতিবেদকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে প্রথম আলোর ভবন থেকেও ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
কেন এই দুটি সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করা হলো, তা স্পষ্ট নয়। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং শেখ হাসিনার শাসনামলেও তারা নানা সময় সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা করায় সরকারপন্থী অংশের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে পূর্ণ বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। এক বিবৃতিতে সরকার জানায়, সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যের ওপর হামলা। দেশের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক উত্তরণ কোনোভাবেই সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।
একই রাতে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথম নির্বাচন।
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন ছাত্র আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষ নেতা এবং তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম মুখ। তিনি প্রতিবেশী ভারত নিয়েও কড়া সমালোচনার জন্য পরিচিত ছিলেন। গত বছরের আন্দোলনের পর বিভিন্ন টকশো ও গণমাধ্যমে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, একই সঙ্গে তৈরি হয় বিরোধিতাও।
আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার একদিন পরই ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন তিনি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস হাদির মৃত্যুকে জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা, যার উদ্দেশ্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা। তিনি বলেন, ভয়, সন্ত্রাস বা রক্তপাতের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের যাত্রা থামানো যাবে না।
সরকার শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন, যার মধ্য দিয়ে তার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের দায়ে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যেখানে সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।















