সুদানের গৃহযুদ্ধ কবলিত করদোফান অঞ্চলে ড্রোন হামলায় অন্তত ১০৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ তৃতীয় বছরে গড়ানোর মধ্যেই এই অঞ্চলে সহিংসতা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
ডিসেম্বরের শুরু থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মধ্য সুদানের করদোফানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এর আগে এক সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ের পর বাবানুসা এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেনাঘাঁটি দখলে নেয় আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)।
এই সহিংসতায় কয়েক দশ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। একই সঙ্গে কলেরা ও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীতে ভরে উঠেছে হাসপাতালগুলো, যেগুলো আগেই সংকটে ছিল। দারফুর থেকে সংঘাতের মূল কেন্দ্র সরে এসে এখন বিস্তীর্ণ করদোফান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয়েছে দক্ষিণ করদোফানের কালোগি এলাকায়। সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেন ও একটি হাসপাতালে ড্রোন হামলায় ৮৯ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে ৪৩ জন শিশু ও আটজন নারী ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এই হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসা স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ করদোফানের রাজধানী কাদুগলিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলাকে ভয়াবহ বলে নিন্দা জানান এবং বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর পরদিন দিলিং সামরিক হাসপাতালেও হামলা হয়। নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, এতে নয়জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন এবং এটিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত হামলা বলে উল্লেখ করেছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলেছেন, ছয়জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসাকর্মী।
সরকারপন্থী সুদানি সশস্ত্র বাহিনী এসব হামলার জন্য আরএসএফকে দায়ী করেছে, যদিও আধাসামরিক বাহিনী এখনো এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সহিংসতার প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর করদোফানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইমান মালিক জানিয়েছেন, রাজ্যটিতে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬০৯ জন কলেরায় এবং ৭৩০ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। সংঘাতের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
উত্তর করদোফান থেকে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়ে গেছে। কাদুগলি ও দিলিংসহ অবরুদ্ধ শহরগুলোতে বহু বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছেন।
পার্শ্ববর্তী হেগলিগ এলাকায়, যা আগে আরএসএফ দখল করে পরে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়, সেখান থেকে প্রায় দুই হাজার মানুষ হোয়াইট নাইল রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে।
করদোফানে সংঘর্ষের এই বিস্তার দারফুরে আরএসএফের দখল অভিযান আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারফুরের এল-ফাশের দখলের সময় পালানোর চেষ্টা করা বেসামরিকদের হত্যা করা হয়েছে এবং পরে লাশ গোপন করতে কবর দেওয়া, পুড়িয়ে ফেলা ও সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি উদ্যোগ আবার শুরু হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শান্তি প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরদিন মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সুদান বিভক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়।
আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির জরুরি নজরদারি তালিকায় টানা তিন বছর শীর্ষে রয়েছে সুদান। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাবে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। একই সঙ্গে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা জাতিসংঘের ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট।
















