মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে যুক্তরাজ্যে নতুন ধরনের সহায়তা কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে এক অভিনব দক্ষতা—স্ট্যান্ড-আপ কমেডি। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু কৌতুক শোনা নয়, বরং নিজে কৌতুক তৈরি ও মঞ্চে পরিবেশন করাও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতে জন্ম নেওয়া ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষিত মোহন গুপ্ত কখনোই ভাবেননি তিনি মানুষকে হাসাতে পারবেন। প্রকৌশলী হিসেবে পড়াশোনা শেষে তিনি একসময় সন্ন্যাস জীবনও বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে স্নায়বিক ভেঙে পড়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে যে ‘প্রেসক্রিপশন’ দেন, তা ছিল বেশ অপ্রত্যাশিত—একটি স্ট্যান্ড-আপ কমেডি কোর্স।
হাসির সঙ্গে স্বাস্থ্যের উপকারিতার সম্পর্ক বহুদিনের। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি মানসিক চাপ কমায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মনোযোগ ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দলগত পরিবেশে নিজে কৌতুক তৈরি ও পরিবেশন করলে মানসিক স্বাস্থ্যে আরও গভীর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই ধারণার ভিত্তিতেই যুক্তরাজ্যে ‘সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’ ব্যবস্থার আওতায় মানসিক চাপে থাকা মানুষদের জন্য কমেডি কোর্স চালু হয়েছে। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসকেরা রোগীদের ওষুধের পাশাপাশি কমিউনিটি-ভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থতা বাড়ে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ কমে।
মোহন গুপ্ত অংশ নেন ‘কমেডি অন রেফারাল’ নামে একটি ১০ সপ্তাহের কোর্সে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের জীবন নিয়ে ১০ মিনিটের স্ট্যান্ড-আপ সেট লিখে ও পরিবেশন করেন। ২০২০ সালে চালু হওয়া এই কোর্সটি ছিল এনএইচএসের অর্থায়নে পরিচালিত প্রথম এমন উদ্যোগ। কোর্সটির উদ্যোক্তা ব্রিস্টলভিত্তিক কৌতুকশিল্পী অ্যাঞ্জি বেলচার বলেন, মানুষকে নিজের জীবনের কষ্টের জায়গা থেকেই হাসির উপাদান খুঁজে নিতে শেখানোই তাঁর লক্ষ্য।
গুপ্ত জানান, এই কোর্স তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার পথে বড় ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল অন্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়া। তাঁর ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের ভেতর থেকে বের করে এনে প্রথমবারের মতো মানুষকে হাসানোর সুযোগ দিয়েছে।
লাফ ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও গবেষক রস বেন-মোশে বলেন, হাসি মানবসভ্যতার প্রাচীনতম মানসিক সহায়ক উপাদানগুলোর একটি। প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে নানা সংস্কৃতিতে কৌতুক ও হাসিকে নিরাময়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর মতে, হাসি মানসিক চাপ কমায়, নিরাপত্তার অনুভূতি জাগায় এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসির ফলে কর্টিসল ও এপিনেফ্রিনের মতো স্ট্রেস হরমোন কমে, বিটা-এন্ডরফিন নিঃসৃত হয়, যা প্রদাহ ও রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এমনকি কিছু গবেষণা বলছে, নিজের জীবনের চাপকে কৌতুকের মাধ্যমে নতুনভাবে দেখলে উদ্বেগ ও হতাশা কমে।
স্ট্যান্ড-আপ কমেডি কোর্সে অংশ নেওয়া আরেক ব্যক্তি রায়ান মুর বলেন, শুরুতে তিনি বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যদের জীবনের অভিজ্ঞতা শুনে তাঁর উপলব্ধি হয়, সবার কষ্টের জায়গাগুলো আসলে অনেকটাই একরকম। তাঁর মতে, এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অন্য যেকোনো থেরাপি বা ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার বাড়তে থাকায় এনএইচএস সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন মানসিক সমস্যার উপসর্গে ভুগছেন, আর আত্মহত্যার হারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কমেডি-ভিত্তিক উদ্যোগগুলোর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। যদিও সব জায়গায় এমন কোর্স সহজলভ্য নয়, তবু বিশেষজ্ঞরা দৈনন্দিন জীবনে হাসির সুযোগ খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। রস বেন-মোশে বলেন, প্রতিদিনের ছোট হাসির মুহূর্তগুলো খেয়াল করা ও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই হতে পারে মানসিক সুস্থতার সহজ পথ।
















