অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছে বিএমইটি
জনশক্তি রপ্তানি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। বিএমইটির বহির্গমন শাখায় রিক্রুটিং এজেন্সির দাপটে বাড়ছে প্রতারণা, মানব পাচার ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন।
বাংলাদেশে সমুদ্রপথে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জনশক্তি রপ্তানি খাতের গভীর দুর্নীতি ও প্রতারণা। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত কয়েকটি প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে সাধারণ কর্মীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, আর মানব পাচারকারীরা হয়ে উঠছে বেপরোয়া।
সরকারি বিধি অনুযায়ী বিএমইটির বহির্গমন শাখা বিদেশগামী কর্মীদের বৈধতা যাচাই ও ছাড়পত্র প্রদানের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে সেখানে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেট। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর ‘রেসট্রিকটেড এরিয়া’ হিসেবে ঘোষিত এই শাখায় অবাধে প্রবেশ করছেন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও দালালরা। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ার-টেবিলে বসে নিজেরাই ফাইল অনুমোদনের কাজ করছেন—এমন চিত্রও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
ভুয়া ও সম্পাদিত পাসপোর্ট, জাল নিয়োগপত্র এবং বেতনের ভুল তথ্য ব্যবহার করে হাজারো কর্মীকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব এজেন্সির নির্দিষ্ট দেশে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন নেই, তারাও নিয়ম ভেঙে শত শত শ্রমিক পাঠিয়েছে। এতে করে সহায়সম্বল বিক্রি করে প্রবাসের স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট এজেন্সি—যেমন টি-২০ ওভারসিজ, দি ইফতি ওভারসিজ, তাকওয়াহ ওভারসিজ ও মিজান সলিউশন সার্ভিস—বিএমইটির ভেতরে কার্যত অঘোষিত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কার্যকর শাস্তির নজির নেই। বরং সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে তারা দিনে দিনে অসংখ্য ফাইল অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক এনফোর্সমেন্ট অভিযানে বিএমইটির কর্মকর্তাদের জাল পাসপোর্ট ব্যবহার, অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মী পাঠানো এবং নিয়ম বহির্ভূত ছাড়পত্র প্রদানের প্রমাণ মিলেছে। দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আলামত পাওয়ার পর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো কেবল ‘আইসবার্গের চূড়া’।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএমইটির কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া জনশক্তি রপ্তানি খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে একদিকে যেমন মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন বাড়বে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ জনশক্তি রপ্তানিও মুখ থুবড়ে পড়বে।
















