ইন্দোনেশিয়ার আগ্রাসনের ৫০ বছর পূর্তিতে পূর্ব তিমুরের রাজনৈতিক ইতিহাস, কূটনৈতিক সংগ্রাম ও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গাজা পরিস্থিতি, পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা এবং পূর্ব তিমুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার আগ্রাসনের আগে সদ্য ঘোষিত পূর্ব তিমুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন রামোস-হোর্তা। আগ্রাসনের আশঙ্কা ঘনীভূত হলে তিনি জাতিসংঘে গিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার আবেদন জানান। তবে জাতিসংঘে সর্বসম্মত সমর্থন সত্ত্বেও ৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশীয় বাহিনী দেশটিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় তার বহু সহকর্মী নিহত হন বা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। দেশে ফিরতে না পেরে পরবর্তী ২৪ বছর তিনি প্রবাসে থেকেই পূর্ব তিমুরের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।
রামোস-হোর্তা বলেন, শীতল যুদ্ধের সময় এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূমিকাও ছিল হতাশাজনক। ইন্দোনেশীয় দখলদারিত্বের সময় ব্যাপক গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও দীর্ঘদিন তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেভাবে উঠে আসেনি। প্রমাণ ও দৃশ্যমান তথ্যের অভাবে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের অভিজ্ঞতাই তাকে আজ ফিলিস্তিন, মিয়ানমারসহ নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে। গাজা পরিস্থিতিকে তিনি আধুনিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, বেসামরিক মানুষ, নারী ও শিশুদের ওপর যে মাত্রায় হামলা চালানো হচ্ছে, তা মানবতার চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। ইহুদি জনগণের ইতিহাস জানার কারণে তিনি ইসরায়েলের কাছ থেকে ভিন্ন আচরণ প্রত্যাশা করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্পর্কে তিনি বলেন, তথাকথিত আন্তর্জাতিক সমাজ, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিচারিতা তাকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল অর্থ সহায়তা দেওয়া হলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা নীরব ভূমিকা পালন করছে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে বক্তৃতা দিলেও বাস্তবে দরিদ্র ও নিপীড়িত দেশগুলোর পাশে তারা দাঁড়ায় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের অর্জন হিসেবে রামোস-হোর্তা বলেন, স্বাধীনতার পর দেশটিতে শান্তি বজায় রাখা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা তার জন্য গর্বের বিষয়। তিনি জানান, পূর্ব তিমুরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
আসিয়ান সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে পূর্ব তিমুর ৭০০ মিলিয়ন মানুষের একটি আঞ্চলিক সম্প্রদায়ের অংশ হবে, যা অর্থনৈতিক সুযোগ, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও তিনি বলেন, পূর্ব তিমুর চীনকে কোনো হুমকি হিসেবে দেখে না এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
গ্রেটার সানরাইজ গ্যাস প্রকল্প নিয়ে রামোস-হোর্তা জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কৃষিখাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদিও পুরো প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগবে, তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা করলেও পূর্ব তিমুর এখনো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে বলে স্বীকার করেন প্রেসিডেন্ট। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
















