হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও প্রসিকিউটররা আজ যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভার তাদের জীবনের প্রতিটি ছোট কাজে ছায়া ফেলছে—ব্যাংকে লেনদেন, অনলাইন কেনাকাটা, এমনকি ইমেইল ব্যবহারও কখনো কখনো হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তায় ভরা এক পরীক্ষা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েল ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তদন্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আইসিসির নয়জন কর্মকর্তা—ছয় বিচারক এবং প্রধান প্রসিকিউটরসহ—কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। তারা যেন হঠাৎই পৃথিবীর আর দশটি অপরাধীর পাশে স্থান পেয়ে গেছেন।
কানাডিয়ান বিচারক কিম্বারলি প্রোস্ট বললেন, “পুরো পৃথিবীটা যেন সংকুচিত হয়ে গেছে। ছোট ছোট অসুবিধা, কিন্তু তারা জমে এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।” তিনি জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তার ক্রেডিট কার্ড বন্ধ হয়ে গেছে, পঠিত ই-বই উধাও হয়েছে, এমনকি আলেক্সাও আর সাড়া দেয় না। অনিশ্চয়তা—এটাই যেন তার নতুন বাস্তবতা।
প্রোস্টের অপরাধ? তিনি ভোট দিয়েছিলেন আফগানিস্তানে সংঘটিত সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ—যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযোগও আছে—তা তদন্তের অনুমতি দিতে। তিনি বলেন, “সারা জীবন অপরাধবিচারের জন্য কাজ করেছি। এখন আমাকে সন্ত্রাস বা সংগঠিত অপরাধে জড়িতদের পাশে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।”
পেরুভিয়ান বিচারক লুজ দেল কারমেন ইবানেজ কারাঞ্জা জানিয়েছেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তার মেয়েরা আর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সম্মেলনে অংশ নিতে পারে না। পরিবার পর্যন্ত এই শাস্তির ভার বহন করছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের আর্থিক বা প্রযুক্তিগত সাহায্য দিলে যে কেউ বিশাল অংকের জরিমানা বা কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দরজা, কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এই কর্মকর্তােরা। আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান বলেন, “কখনো কার্ড কাজ করে না, আর তখন ভাবি—এটা কি কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা, নাকি নিষেধাজ্ঞার ছায়া?”
তবে অভিযোগ শুধু নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম এমইই জানিয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানকে নানা দিক থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে। এক ব্রিটিশ-ইসরায়েলি আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে বলা হয়েছে—যদি তিনি পরোয়ানা প্রত্যাহার না করেন, আদালতটিকে “ধ্বংস” করা হবে।
এমনকি যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও হুমকি দিয়েছিলেন, আইসিসি যদি পরোয়ানা জারি করে, লন্ডন তহবিল বন্ধ করবে ও সংস্থাটি থেকে সরে আসবে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও একই হুমকি দিয়েছিলেন ২০২৪ সালে।
এই সব চাপের মধ্যে করিম খান বর্তমানে জাতিসংঘ পরিচালিত এক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে বিরত রয়েছেন—যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হেগের সেই ভবনটি—যেখানে ন্যায়বিচারের স্বপ্ন লালন করা হয়—আজ যেন এক নাটকীয় দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক আইন ও শক্তির রাজনীতির মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আইসিসি কর্মকর্তারা নীরবে লড়াই করে যাচ্ছেন—তাদের ন্যায়বিচারের পথ যতই সংকীর্ণ হোক না কেন, মনোবল যেন এখনও টলছে না।
















