দক্ষিণ লেবাননের আকাশ আবারো কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান একের পর এক হামলা চালিয়েছে জাজ্জিন ও জাহরানি অঞ্চলের পাহাড়-উপত্যকায়, যেখানে তারা দাবি করছে হিজবুল্লাহর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল। আল-আইশিয়েহ থেকে আনসার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা, জাবাল আল-রাফিয়ে থেকে বিভিন্ন গ্রামের উপকণ্ঠ—সবখানেই বোমার শব্দে কেঁপে উঠেছে নীরব সকাল।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ডজনখানেক স্থানে আঘাত হেনেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, তারা হিজবুল্লাহর রাদওয়ান বাহিনীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও রকেট উৎক্ষেপণ স্থাপনা টার্গেট করেছে—তাদের ভাষায়, “ইসরায়েলি বাহিনী ও নাগরিকদের ওপর পরিকল্পিত হামলার প্রতিরোধেই” এই অভিযান।
বেইরুট থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক জেইনা খোদর জানিয়েছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যত একপক্ষীয়। “হামলা প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। এবারও তারা জনবসতিহীন পাহাড়-উপত্যকা বেছে নিয়েছে—যেন আগের রাতগুলোর পুনরাবৃত্তি,” বলেন তিনি।
জাতিসংঘের তথ্য আরও অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে অন্তত ১২৭ লেবাননি—শিশুরাও আছে সেই তালিকায়—ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এসব আক্রমণ “যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে” পড়তে পারে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে ‘সামরিক চাপের এক দীর্ঘ ধারার’ অংশ হিসেবে এ হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েল চায় হিজবুল্লাহ তাদের দীর্ঘ-পাল্লার মিসাইল, নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র ও ড্রোন সরিয়ে দিক—যেগুলো তাদের ধারণা বেকা ভ্যালি ও দেশের ভেতরের আরও গভীরে সঞ্চিত আছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ বলছে, ইসরায়েল যখন বোমা ফেলে এবং ভূখণ্ড দখল করে রাখে, অস্ত্র নামিয়ে রাখা মানেই আত্মসমর্পণ।
দুই সপ্তাহ আগেই উত্তেজনা তীব্রতর হয়, যখন ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার হাইসম আলি তাবাতাবাই। সংগঠনটি তখনই ঘোষণা করেছিল—প্রত্যাঘাত আসবে, সময় হলে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই বহু বছর পর লেবানন ও ইসরায়েল তাদের বেসামরিক দূত পাঠিয়েছে যুদ্ধবিরতি তদারকি কমিটির বৈঠকে—একটি সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পথ খুলে দিয়ে। তবে হিজবুল্লাহর নেতা নাইম কাসেম লেবাননের প্রতিনিধি প্রেরণকে বলেছেন “ইসরায়েলকে বিনা দামে ছাড় দেয়া”।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সম্প্রতি বলেছেন, দেশটি “যুদ্ধ থামাতে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম আরও শক্তিশালী যাচাই ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ইসরায়েলি হামলা ও হিজবুল্লাহর স্থাপনা অপসারণ উভয়ই মনিটর করা যায়।
কিন্তু হতাশা রয়ে গেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসা স্পষ্ট বলেছেন—“এক টেবিলে বসা মানে এই নয় যে ইসরায়েলি হামলা থামবে।”
দক্ষিণ লেবাননের রাত তাই এখনো শান্ত নয়। ছিন্নভিন্ন যুদ্ধবিরতি যেন প্রতিদিন নতুন করে রক্তাক্ত পাতা লিখছে—পাহাড়ের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অস্থিরতার গন্ধ, আর অপেক্ষা করছে, এই অনিরাপদ আকাশের নীচে আলোচনার পথ আদৌ কোনো ভোর আনতে পারবে কি না।
















