সমুদ্রের ওপর থেকে তাকালে শুধু ঢেউয়ের ওঠানামা দেখা যায়। কিন্তু সেই নীলের নিচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পাহাড়—ডুবে থাকা আগ্নেয়গিরির চূড়া, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলেন সিমাউন্ট। পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা এসব পানির নিচের পর্বত যেন অদৃশ্য নক্ষত্রমণ্ডল, আর সেগুলোর চারপাশে ঘুরে বেড়ায় হাঙরের দল।
গভীর সমুদ্রে যখন প্রবল স্রোত আঘাত হানে এসব পাহাড়ি ঢালে, তখন সমুদ্রের ভেতরে তৈরি হয় অদ্ভুত এক জগত। হাজার মিটার উঁচু এসব জলতলের পর্বত যেমন রহস্যময়, তেমনই বিপুল প্রাণের আশ্রয়। কোথাও খাড়া দেয়াল, কোথাও গর্ত, কোথাও উপরে চওড়া সমতল—প্রতিটি সিমাউন্ট যেন একেকটি নিজস্ব সাম্রাজ্য। এখানে প্রবালের ঝাড়, কাঁকড়া-ঝিনুক, রঙিন মাছ, অক্টোপাস, কচ্ছপ, ডলফিন—আর তাদের শাসক, হাঙর।
বিশ্বের সমুদ্রজুড়ে এমন সিমাউন্টের সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি বলে মনে করা হয়। অথচ এর এক শতাংশও ঠিকমতো অনুসন্ধান করা হয়নি। তবুও সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে দেখা যাচ্ছে—এসব গভীরপাহাড় যেন হাঙরের অদৃশ্য রাজপ্রাসাদ।
অ্যাসেনশন আইল্যান্ডের কাছে সমুদ্র অভিযানে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছিলেন এই রহস্যের নতুন চিহ্ন। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে ছোট্ট সবুজ দ্বীপটি আসলে এক প্রাচীন আগ্নেয়গিরির মাথা, যার চারপাশে সারি বেঁধে রয়েছে ডুবে থাকা পাহাড়। সেগুলোর কিছু গভীরে, কিছু আবার প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে এসেছে।
মেরিন জীববিজ্ঞানী স্যাম ওয়েবার এসব সিমাউন্টে কাটিয়েছেন টানা ১৬ দিন। স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে ছোট নৌকায় থেকে তিনি ধরেছেন ও ট্যাগ করেছেন অসংখ্য হাঙর। তাঁর দল দেখেছে—সাগরের খোলা জলের তুলনায় এসব পাহাড়ে হাঙরের উপস্থিতি ৪১ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, বড় শিকারি মাছের বৈচিত্র্য ৫ গুণ, আর মোট জৈব ভর ৩০ গুণ বেশি।
কেন এত হাঙর এখানে ভিড় করে—তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কেউ বলেন, সিমাউন্ট তাদের খাবারের ভান্ডার। কেউ বলেন, দিকনির্ণয়ের চিহ্ন। এসব আগ্নেয় পাহাড়ের ভেতরে জমে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্র হয়তো হাঙরকে পথ দেখায়, এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে সাহায্য করে।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো—‘ওয়েসিস তত্ত্ব’। গভীর স্রোত যখন সিমাউন্টে ধাক্কা খায়, তখন ঠান্ডা পুষ্টিকর জল উপরের দিকে উঠে আসে। তাতে জন্ম নেয় ছোট উদ্ভিদজাত প্রাণ, সেগুলো খেতে আসে ছোট মাছ, আর তাদের পিছু নেয় বড় শিকারি—এভাবে পুরো খাদ্যজগত জমজমাট হয়ে ওঠে।
তার বিপরীত ব্যাখ্যা—‘হাব তত্ত্ব’—বলছে, হয়তো এসব প্রাণীরা খোলা সমুদ্রে খাবার খুঁজে ফিরে এসে সিমাউন্টকে ব্যবহার করে বিশ্রাম, মিলন বা শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। ওয়েবারের ভাষায়, এটা যেন সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা “সার্ভিস স্টেশন”—দীর্ঘ ভ্রমণের পথে যেখানে হাঙররা দাঁড়িয়ে নেয় নিঃশ্বাস, সঞ্চয় করে শক্তি, আবার ঝাঁপিয়ে যায় নীল অন্ধকারে।
কিছু হাঙর রাতে শত কিলোমিটার দূরে খাবারের খোঁজে যায়, আবার ভোরে একই পাহাড়ে ফিরে আসে। যেন এটি তাদের নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু—একটি অদৃশ্য মানচিত্রে অঙ্কিত আশ্রয়।
এসব পাহাড়ের চারপাশেও তৈরি হয় এক অদ্ভুত “হালো অঞ্চল”—শিকারি ও অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়ে চূড়া থেকে বহু কিলোমিটার দূর পর্যন্ত। যেন জীবন এখান থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রজুড়ে।
কিন্তু এই আশ্চর্য জীবন-ভূমি আছে চরম বিপদের মুখে। বহু বছর ধরে শিল্প মাছধরা নৌযান এসব এলাকায় করে আসছে বটম ট্রলিং—যেখানে ভারী জাল টেনে সমুদ্রতল থেকে সবকিছু তুলে নেওয়া হয়। এতে নষ্ট হয়ে যায় হাজার বছরের পুরোনো প্রবাল, স্পঞ্জ, ধ্বংস হয় সম্পূর্ণ খাদ্যজগত। আর হাঙর—যারা ধীরগতিতে বাড়ে, কম সন্তান দেয়—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই ধরাপাকড়ের জালে।
গবেষকেরা বলছেন, এসব সিমাউন্ট রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই কিছু অঞ্চল সুরক্ষিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ২০২৬ সালের মধ্যে সিমাউন্টে বটম ট্রলিং বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
কারণ এ শুধু হাঙরের রাজ্য নয়—এ পৃথিবীর গভীরতম নীলের গোপন বাগান, যেখানে প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি শিলা, প্রতিটি স্রোত বয়ে আনে জীবনের ছন্দ। সেগুলো হারিয়ে গেলে হারাবে সমুদ্রের ভবিষ্যৎ, হারাবে পৃথিবীর নীরব স্পন্দন।
















