মন-বদলে দেওয়া সাইকেডেলিকস মানুষের পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা আর দীর্ঘদিন জমে থাকা ভাবনাকে নতুন আলোয় দেখাতে পারে—এমন প্রমাণ দিন দিন বাড়ছে। অনেকের কাছেই এ ওষুধগুলো এমন সব অনুভূতির দরজা খুলে দিচ্ছে, যেগুলোর অস্তিত্ব তারা হয়তো কখনো বুঝতেই পারেননি।
হান্ট প্রিস্ট, যিনি জীবনের প্রথম ৬০ বছর নিজেকে নিঃসন্দেহে ‘স্ট্রেইট’ মনে করতেন, ছিলেন সুখী দাম্পত্যে, চার্চের জ্যেষ্ঠ ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করতেন। পুরুষের প্রতি সামান্য আকর্ষণ থাকলেও তা কখনো তার জীবনের প্রধান অনুভূতি ছিল না। কিন্তু ২০১৬ সালে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাইকেডেলিক গবেষণায় অংশ নেওয়ার পর তাঁর জীবনে শুরু হল নীরব, কিন্তু গভীর পরিবর্তন।
সেখানে দুই দফায় তিনি পেলেন সাইলোসাইবিনের ডোজ। অভিজ্ঞতা ছিল অভাবনীয়—দেহময় ঈশ্বরিক উপস্থিতি, স্পর্শহীন এক ধরনের প্রেম আর উষ্ণতার অনুভূতি। যৌনতা নয়, বরং ভেতরের কোনো আধ্যাত্মিক স্রোত যেন খুলে দিল নতুনভাবে দেখার ক্ষমতা। তখনই তিনি লক্ষ করলেন, তাঁর মন আরো উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
এরই মধ্যে জীবনে এল আরও কিছু বদল—নতুন শহর, নতুন কাজ, ছেলের কলেজে যাত্রা, আর সবচেয়ে বড় আঘাত—স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ। কয়েক বছর পর, একদিন এক পরিচিত পুরুষের সঙ্গে কফিতে বসে তিনি অনুভব করলেন অচেনা একটি নরম টান। ধীরে ধীরে সেই অনুভূতিই রূপ নিল সম্পর্কে। প্রিস্ট বলেন, সাইকেডেলিকস তাঁকে বদলে দেয়নি, বরং তাঁর ভেতরের সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে বুঝতে সাহায্য করেছে।
গবেষণা বলছে, এমন অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর নয়। বহু মানুষই বলছেন, সাইকেডেলিকস যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে গভীর আত্ম-অন্বেষণের পথ খুলে দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই জানায় যে এসব ওষুধ তাঁদের নতুন ধরনের আকর্ষণ বা পরিচয়ের অনুভূতি উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে। কেউ হঠাৎই অনুভব করেছেন ভিন্ন লিঙ্গের দিকে আকর্ষণ, কেউ আবার অনুভব করেছেন যে লিঙ্গের ধারণাই যেন ভেঙে গেছে—সবকিছু মিলেমিশে গেছে এক অদ্ভুত, অসীম উপলব্ধিতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বহু স্থানে এখন এসব ওষুধকে নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসায় ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এগুলো বাড়িতে বা নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাইকেডেলিকস মানুষের ‘সামাজিক প্রোগ্রামিং’কে নরম করে দেয়—যে ভাবনা, ভয় বা লজ্জা মানুষকে নিজের ভেতরের সত্যিকে দেখতে বাধা দেয়, সেগুলো যেন ধীরে ধীরে সরে যায়। ফলে পুরোনো পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কেউ দেখতে পায় নিজের অদেখা পরিচয়, কেউ খুঁজে পায় লিঙ্গের প্রতি নতুন উপলব্ধি।
নিউইয়র্কের ৩৯ বছর বয়সী শেইনা ব্রাসার্ডের অভিজ্ঞতাও ঠিক এমন। কেটামিন-সহায়িত থেরাপির পর তিনি উপলব্ধি করেন যে দীর্ঘ এক ঘণ্টা তিনি নিজের দেহ বা নারী পরিচয় ভাবেনইনি। যেন তিনি শুধুই এক চেতনা। সেই উপলব্ধি তাঁকে নিজের প্রতি নতুন মমতা দিয়েছে—আরো সহনশীল করেছে অন্য সকল লিঙ্গের মানুষের প্রতি।
আয়াওয়াসকা সেবনের পর অস্ট্রেলিয়ার গবেষক ক্যাটরিওনা ওয়ালেস বুঝেছিলেন, তিনি প্রচলিত ‘নারী’ পরিচয়ের সীমানার ভেতর আর ঠিকঠাক ফিট হন না। পরে তিনি নিজেকে নন-বাইনারি হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা তাঁর জীবনে এনেছে স্বস্তি, যদিও কিছু সম্পর্ক ভেঙেও গেছে।
একইভাবে, নিউ জার্সির ৬০ বছর বয়সী রোব বহু দশকের লুকিয়ে থাকা লজ্জা ও ভয়কে মোকাবিলা করেন সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। কৈশোরে ‘গে’ পরিচয় নিয়ে যে ভয় ও ঘৃণা তিনি নিজের মাঝে গেঁথে নিয়েছিলেন, সেগুলো ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে। আজ তিনি বলেন, এসব ওষুধ তাঁকে বদলে দেয়নি; তাঁকে নিজের সত্যি সত্তাকে গ্রহণ করতে সাহায্য করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার পর সঠিক সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিচয় বদল বা প্রশ্নবোধক হয়ে ওঠা অনেক সময় একাকীত্ব বা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। উপযুক্ত থেরাপি, সহানুভূতিশীল বন্ধু-পরিবার—এসবই প্রয়োজন হয় নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করার জন্য।
শেষ পর্যন্ত, মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন একটাই—আমি কে?
কেউ উত্তর পায় সম্পর্কের মধ্যে, কেউ আঘাতে, আর কেউ সাইকেডেলিকসের জাগানো আলোতে।
অচেনা সেই আলো কখনো পথ হারায় না—বরং বলে দেয়, নিজের সত্যিকারের রূপটিই সবচেয়ে সুন্দর।
















