বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী থেকে আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি এখন নিজেদেরকে উদার, গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
২০২৪ সালের গণবিপ্লবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের ১৬ মাস পর এমন বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়নের অভিযোগ বাড়তে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে দেশের উদার-ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে আসলেও সমালোচকরা বলেন, দলটি ক্ষমতায় থেকে দমনমূলক আচরণে সেই পরিচয়ের প্রতি অন্যায্য আচরণ করেছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াত মূলত আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় একজোট হয়েছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আদর্শে চালিত বিএনপি এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু বানানো জামায়াতের আদর্শগত পার্থক্য সবসময়ই ছিল।
সাম্প্রতিকভাবে এই ভাঙন প্রকাশ্যে এসেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ অ-হাসিনা সরকারের সময় যে দুই দল ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছিল, এবার সেই জোটে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
এই সপ্তাহে দলীয় সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরেন এবং ইঙ্গিত দেন যে জনগণ সে সময় যা ঘটেছিল তা জানে। তিনি জামায়াতের নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট, কারণ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল দলটি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট আদায় করতে চায় জামায়াত।
গত মাসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ধর্মের নামে দেশকে বিভক্ত করার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, বিএনপির রাজনীতি হওয়া উচিত জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে ১৯৭১-এর চেতনায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের পতনের পর ফাঁকা হয়ে যাওয়া উদার-ধারার রাজনৈতিক জায়গাটিকে কাজে লাগাতে চাইছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ যে কঠোর দমননীতি চালিয়েছিল—জামায়াত নিষিদ্ধ করা, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা এবং তিনটি নির্বাচনকে বিতর্কিতভাবে জয় করা—তার কারণে উদার-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে থাকায় রাজনৈতিক ক্ষেত্র সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজছে। এই সুযোগে বিএনপি ইসলামি দলটির ঐতিহাসিক দায়মুক্তি ঝেড়ে ফেলে নিজেদের নতুন ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে।
দুই দলের দূরত্ব গত কয়েক মাসে আরও বেড়েছে। সংস্কার আগে না নির্বাচন—মূলত এই প্রশ্নেই গুরুতর মতবিরোধ তৈরি হয়। জামায়াত যেখানে বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলছিল, বিএনপি চাইছিল দ্রুত নির্বাচন ও সীমিত সাংবিধানিক সংশোধন।
বিএনপি মনে করে, ২০২৪ সালের যুব-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর জনগণের চাহিদা বদলে গেছে। মধ্যবিত্ত, তরুণ প্রজন্ম ও শহুরে ভোটাররা এখন দমনমূলক শাসনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সংস্কার ও সমন্বিত রাজনীতি দেখতে চান। জামায়াতের ধর্মনির্ভর রাজনীতি এই পরিবেশে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।
দলটি ১৯৭১ সালের নৈতিক উচ্চভূমিও পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। এতদিন আওয়ামী লীগ জামায়াতের পাকিস্তাপন্থী ভূমিকার দায় বিএনপির উপর চাপিয়ে এসেছে। এবার বিএনপিই সেই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে তরুণ ভোটারদের কাছে নতুন বার্তা দিতে চায়।
তবে এই পরিবর্তনের পথে ঝুঁকিও রয়েছে। দলটির অভ্যন্তরেও অনেকেই নতুন উদার অবস্থান গ্রহণে দ্বিধা প্রকাশ করতে পারেন। অন্যদিকে নতুন উদার-ধারার দল, নাগরিক আন্দোলন এবং সুশীলসমাজও একই ভোটব্যাংকের দিকে নজর দিচ্ছে—ফলে ভোট বিভাজনের শঙ্কা আছে।
তবুও, বিএনপির কৌশলগত পরিবর্তন এখন দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলটি আর কেবল কেন্দ্র-ডান দল হিসেবে নয়, বরং প্রাক্তন আওয়ামী লীগ সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নাগরিক অধিকারকামী তরুণ ও উদারমনা ভোটারদের জন্য একটি নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে চাইছে।
এই রূপান্তর সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে দলটি কতটা ধারাবাহিকভাবে নতুন আদর্শে অবিচল থাকতে পারে এবং জনগণ এই পরিবর্তনকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করে—তার উপর।
কিন্তু এক বিষয় স্পষ্ট: ২০২৫ সালের বিএনপি আর আগের বিএনপি নয়। তাদের বক্তব্য এখন অন্তর্ভুক্তি, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের নতুন ভাষায় গড়া—যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
















