দোহা, কাতার— মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন এখনও বারুদের গন্ধ, তখন দোহা ফোরামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাআ উচ্চারণ করলেন শান্তির ভাষা। কণ্ঠে ছিল ক্ষতবিক্ষত ভূমির আর্তনাদ, চোখে ছিল যুদ্ধক্লান্ত মানুষের স্বপ্ন। তিনি বললেন, ইসরায়েল সারা অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসন চালাতে “নিরাপত্তা”কে অজুহাত বানাচ্ছে, গাজায় চালানো ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে নতুন নতুন সংকট রপ্তানি করছে।
সিএনএনের সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-শারাআ বলেন, ইসরায়েল যেন অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করছে—ভূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে তারা। তার কথায় প্রতিধ্বনিত হয় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ: একটিমাত্র ঘটনার ছায়া টেনে এনে চারপাশের সমস্ত আগ্রাসনকে জায়েজ করছে তেলআবিব।
বাশার আল-আসাদের শাসনের পতনের পর থেকে সিরিয়ায় আকাশ যেন শান্তির রঙ হারিয়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলা বারবার ছিন্নভিন্ন করেছে গ্রাম-শহর, কেড়ে নিয়েছে শত শত প্রাণ। দামেস্কের উপকণ্ঠে বেইত জিন্ন শহরে সাম্প্রতিক হামলা, দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান, গভীরতর অনুপ্রবেশ, চেকপোস্ট স্থাপন, অবৈধ আটক—সব মিলিয়ে সিরিয়ার মাটি যেন প্রতিদিনই নতুন ক্ষতে রক্ত ঝরাচ্ছে।
তবু আল-শারাআ জানালেন, তাঁর সরকার যুদ্ধ নয়, স্থিতিশীলতার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা বার্তা পাঠিয়েছি, আমরা শান্তি চাই। আমরা এমন দেশ হতে চাই না, যেখানে সংঘাত রপ্তানি করা হয়—ইসরায়েলের দিকেও নয়।” কিন্তু তার বদলে এসেছে সহিংসতার জবাব, আকাশসীমা লঙ্ঘন, আর সীমাহীন শক্তির প্রদর্শন।
তিনি স্মরণ করালেন ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নতা চুক্তির কথা—যেটি ইয়োম কিপুর যুদ্ধের পর গঠিত হয়েছিল, যা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল, যা অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে ছিল। আল-শারাআ বললেন, সেই চুক্তি ভাঙা, কিংবা নতুন “বাফার জোন” বানানোর ভাবনা এই অঞ্চলকে আরও বিপজ্জনক অন্ধকারে ঠেলে দেবে। প্রশ্ন তুললেন, যদি সৈন্যবিহীন এলাকা তৈরি হয়, তবে কে পাহারা দেবে সেই নীরব প্রান্তর?
তার কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেন, “ইসরায়েল আমাদের আক্রমণ করছে, আমরা তাদের নয়।” তার কাছে তাই প্রশ্ন—পিছু হটার দাবি তোলার অধিকার কার বেশি?
দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রসঙ্গে তিনি ভাঙা দেয়ালের কথাও স্বীকার করেন। বলেন, সিরিয়া এখন জেগে উঠেছে, সচেতন হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ ঐক্য পৃথিবীর কোনো দেশেই সম্ভব নয়। আল-আসাদ যুগের উত্তরাধিকার হিসেবে মানুষের মধ্যে বিভাজন ছিল, অবিশ্বাস ছিল। সেই ক্ষত সারাতে তিনি বহুজনকে ক্ষমা করেছেন, বহু গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতার হাত বাড়িয়েছেন, যেন ভবিষ্যৎ হয় নিরাপদ, টেকসই।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিপ্লব কোনো একটি ধর্মগোষ্ঠীর ছিল না। সুন্নি, আলাউই, সব সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল এর অংশ। আলাউইদের একাংশ ভয় নিয়ে বেঁচেছিল, শাসকের ব্যবহৃত হাতিয়ার হয়ে তারা নিজেরাও মূল্য দিয়েছে। তবু বাস্তবতা ছিল রক্তাক্ত। চলতি বছরে উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সুয়াইদায় বেদুইন গোত্রের সঙ্গে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে শত শত, হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে।
এই অপরাধ অস্বীকার করেননি আল-শারাআ। তিনি বলেন, যা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, “সিরিয়া আইন দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র, এবং আইনই একমাত্র পথ—যাতে সবার অধিকার রক্ষা হয়।”
নারীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বললেন, তার শাসনে নারীরা ক্ষমতায়িত। তাদের অধিকার সুরক্ষিত, সরকার ও সংসদে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চেষ্টা চলছে। তিনি হাস্যরসের সুরে বলেন, “সিরিয়ার নারীদের জন্য ভয় করবেন না, বরং সিরিয়ার পুরুষদের জন্য ভয় করুন।”
সবশেষে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ভবিষ্যৎ সিরিয়ার হাত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানেই, কোনো একক ব্যক্তির হাতে নয়। তিনি জানান, এখনই নির্বাচন সম্ভব নয়, তবে সাময়িক সংবিধান ঘোষণার পাঁচ বছরের মধ্যেই সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তার কণ্ঠে শেষ যে কথাটি ভেসে আসে, তা যেন এক বিধ্বস্ত দেশের প্রতিজ্ঞা—জনগণই নেতৃত্ব বেছে নেবে, মানুষের সন্তুষ্টিই হবে শাসনের ভিত্তি, আর যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সিরিয়া একদিন খুঁজে পাবে নিজের শান্তির সকাল।
















