যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এখন তীব্র রাজনৈতিক চাপ ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে। ক্যারিবীয় সাগরে এক নৌকায় ধারাবাহিক দুই দফা হামলার অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—দ্বিতীয় হামলার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, আর আদৌ তা বৈধ ছিল কি না।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ারের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলা থেকে আসা বলে দাবি করা একটি নৌকায় হামলা চালায়। প্রথম হামলায় নৌকাটি বিধ্বস্ত হয়, প্রাণ হারান নয়জন। ভেসে থাকা ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন দুইজন। কিন্তু পরে আসে দ্বিতীয় আঘাত—যা শেষ করে দেয় সেই দুই প্রাণের শেষ আশাটুকুও।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে আসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মৌখিক নির্দেশ—যা নাকি “সবাইকে হত্যা করার আদেশ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এরপর মিশন কমান্ডার অ্যাডমিরাল ফ্র্যাঙ্ক ব্র্যাডলি দ্বিতীয় হামলার নির্দেশ দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বিতীয় আঘাত—যা সামরিক পরিভাষায় “ডবল ট্যাপ”—আইনগতভাবে অবৈধ। শুধু ডেমোক্র্যাট নয়, রিপাবলিকান নেতারাও বিষয়টি তদন্তের দাবি তুলেছেন। সেনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটি জানিয়েছে, তারা পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখবে। প্রতিনিধি পরিষদও একইভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাইছে, চেয়েছে অডিও রেকর্ডিং ও অন্যান্য প্রমাণ।
এদিকে অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ারে এখন পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে ২০টিরও বেশি নৌযান।
হেগসেথ অবশ্য দাবি করেছেন, সবকিছু আইন মেনেই হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাদকবাহী নৌকা ধ্বংস করা এবং “আমেরিকানদের বিষ ছড়ানো সন্ত্রাসীদের নির্মূল করাই” ছিল উদ্দেশ্য। ট্রাম্প প্রশাসন এ বছর ভেনেজুয়েলার গ্যাং ট্রেন দে আরাগুয়া-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থারাই বলছে—এই গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কোনো সম্পর্ক নেই।
ট্রাম্প নিজেও ঘটনার ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। বিমানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং তিনি এমন দ্বিতীয় হামলা “চাননি”। তবে হেগসেথ তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি নাকি ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করার নির্দেশ দেননি।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট দ্বিতীয় হামলাকে যুক্তি দিয়ে বলেছেন—এটি ছিল আত্মরক্ষার পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিচালিত, আইনের মধ্যেই।
হোয়াইট হাউস বলছে, হেগসেথই অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলিকে “স্ট্রাইকসমূহের” অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় হামলার সিদ্ধান্ত ছিল ব্র্যাডলির নিজস্ব।
আইন বিশেষজ্ঞ র্যাচেল ভ্যানল্যান্ডিংহ্যামের মতে, ধ্বংসস্তূপ আঁকড়ে থাকা দুজন বেঁচে থাকা মানুষের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তাঁর ভাষায়, “যারা ডুবে যাওয়ার পর প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করছে, তারা আইনের চোখে সুরক্ষিত। তাদের হত্যা করা নির্মম ও বেআইনি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত হুমকি না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের অধিকার নেই। তাই দ্বিতীয় হামলার নির্দেশদাতা কে—এই প্রশ্নের উত্তরই আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার আদ্যোপান্ত এখন তদন্তের আলোয়। কিন্তু ক্যারিবীয় সাগরের ঢেউ যেন এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই হতভাগ্য নৌকার শেষ আর্তনাদ—কার নির্দেশে নিভে গেল দুটি জীবন, আর কোন যুক্তিতে?
















