জর্জিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যবহৃত পানি কামানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়েছে বলে নতুন প্রমাণ পেয়েছে বিবিসি। রাজধানী তিবিলিসির রাস্তায় পানির জেট লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ত্বক পুড়তে থাকা অনুভূতি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, কাশি, বমি ও চোখ জ্বালাসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়—যা সাধারণ ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত CS গ্যাসের সঙ্গে মেলে না বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া স্থগিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের পর তিবিলিসিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। পুলিশের পানি কামান, পেপার স্প্রে ও CS গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা পানিতে রহস্যময় রাসায়নিকের কারণে তীব্র ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ এবং এমন অনুভূতির কথা জানান যা সহজে ধুয়ে যায় না; বরং পানি লাগানোতেই আরও বাড়ে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ড. কনস্তান্তিন চাখুনাশভিলি, যিনি নিজেও আক্রান্ত হন, সামাজিক মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে ৩৫০ জনের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন। প্রায় অর্ধেক জানান, ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে তাদের মাথাব্যথা, অবসাদ, শ্বাসকষ্ট, বমি ও কাশি ছিল। ডাক্তারের পরীক্ষা করা ৬৯ জনের হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতে অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়। তাঁর এই গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নাল Toxicology Reports–এ প্রকাশের অপেক্ষায়।
বিবিসি তদন্তে জর্জিয়ার দাঙ্গা দমন বিভাগের কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। সাবেক অস্ত্র কর্মকর্তা লাশা শেরগেলাশভিলি জানান, ২০০৯ সালে তাঁকে যে মিশ্রণ পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছিল, তা এতটাই তীব্র ছিল যে শ্বাস নেওয়া পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল এবং পানি ও বেকিং সোডার দ্রবণ ব্যবহার করেও জ্বালা কমানো যায়নি। তাঁর মতে, বিক্ষোভে ব্যবহৃত রাসায়নিক সেই একই মিশ্রণ। তিনি বলেন, এই রাসায়নিকের প্রভাব এত বেশি যে ছিটিয়ে দিলে দুই-তিন দিন পর্যন্ত এলাকায় থাকা যায় না।
বিবিসি দাঙ্গা পুলিশ বিভাগের ২০১৯ সালের একটি ইনভেন্টরি নথি সংগ্রহ করে, যাতে দুটি রাসায়নিকের উল্লেখ ছিল—“Chemical liquid UN1710” (ট্রাইক্লোরোইথিলিন বা TCE) এবং “Chemical powder UN3439”। UN3439 কোডের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যে মিশ্রণ ভিড় দমনে ব্যবহৃত হতে পারে এমন একমাত্র রাসায়নিক হলো ব্রোমোবেঞ্জিল সায়ানাইড, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় “কামাইট” নামে ব্যবহৃত হতো।
বিষ ও রাসায়নিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ক্রিস্টোফার হোলস্টেজ বিবিসির সংগ্রহ করা প্রমাণ—বিক্ষোভকারীদের উপসর্গ, চিকিৎসা তথ্য, পুলিশের ইনভেন্টরি এবং সাবেক কর্মকর্তাদের বর্ণনা—পর্যালোচনা করে বলেন, লক্ষণগুলো “কামাইট”–এর সঙ্গেই মিলে। তাঁর মতে, এটি আধুনিক দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত সাধারণ CS গ্যাসের চেয়ে বহু গুণ শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তিনি সতর্ক করেন, এটি ব্যবহার করা “অত্যন্ত বিপজ্জনক”।
জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস এডওয়ার্ডস বলেন, এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার “মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন” এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকলে তা নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তিনি বলেন, জনগণের উপর কোনো ধরনের পরীক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহার করা বেআইনি।
জর্জিয়া সরকার বিবিসির তদন্তকে “হাস্যকর” ও “অবাস্তব” বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, পুলিশ আইনি সীমার মধ্যেই “অপরাধীদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের” প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
গত এক বছরে জরিমানা ও সাজা বাড়ালেও রুস্তাভেলি অ্যাভিনিউতে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ—সরকার নির্বাচন জালিয়াতি করেছে, রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করছে এবং নাগরিক সমাজ সীমিত করতে কঠোর আইন করছে। সরকার ও শাসক দল জর্জিয়ান ড্রিম অবশ্য রাশিয়াপন্থীত্ব অস্বীকার করে বলছে, সাম্প্রতিক আইন পরিবর্তন জনগণের কল্যাণেই করা হয়েছে।
















