৪ অক্টোবর ২০২৫
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজ ব্যবহার করে খাদ্যশস্য ও অপরিহার্য পণ্যের স্টকপাইলিং ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করার ঘটনা আবারও সামনে এসেছে। বন্দরের সূত্রে জানা গেছে, এমন কার্যক্রম সাধারণত রামাদান উপলক্ষে বাড়ে, তবে এবার তা অপ্রত্যাশিতভাবে আগেভাগেই শুরু হয়েছে।
বন্দরের অভিযান চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি (CPA) বৃহস্পতিবার বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর আউটার অ্যাঙ্করেজে অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে ৬টি লাইটার জাহাজ, যেগুলিতে প্রায় ৭,০০০ টন গম ছিল, জরিমানা করা হয়। এদের ১৫ দিন ধরে লোডিং অবস্থায় থাকার কারণে জরিমানা করা হয়েছে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী মাদার ভেসেল থেকে আনা পণ্য ৭২ ঘন্টার মধ্যে খালাস করতে হবে। এছাড়াও, কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোকে বন্দরের জলপথ থেকে অবিলম্বে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছে।

CPA সেক্রেটারি ওমর ফারুক নিশ্চিত করেছেন, “আমরা নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেট নেতৃত্বাধীন টিম পাঠাই যে লাইটার জাহাজগুলি অযথা দাঁড়িয়ে আছে কি না বা অবৈধ কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য। বৃহস্পতিবারের অভিযান রুটিন মনিটরিংয়ের অংশ ছিল, তবে কখনও কখনও গোপন সূত্রের ভিত্তিতেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।”
বাজার ও ব্যবসায়ীদের কৌশল শিল্পের অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, আমদানিকারীরা স্থানীয় মূল্য কমে গেলে বা বিদেশি বাজারে রফতানি বুকিং হ্রাস পেলে পণ্য স্টক করতে লাইটার জাহাজ ব্যবহার করেন, পরে দাম বৃদ্ধির জন্য পণ্য মুক্তি দেন।
পূর্বে তাঁরা মূলত গুদামে পণ্য রাখতেন, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকেই লাইটার জাহাজে পণ্য রাখছে, যা খরচ কমায় এবং সরকারের নজরদারি এড়াতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে তারা স্টক লেভেল লুকিয়ে রাখে এবং কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। সবচেয়ে বেশি স্টক হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, চাল, ডাল, তেল, চিনি ও সরিষা।
লাইটার জাহাজ ব্যবহারের প্রক্রিয়া চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য সাধারণত বড় মাদার ভেসেল এ আসে এবং পরে ছোট লাইটার জাহাজে নদীর ৩৮টি রুট ব্যবহার করে স্থানান্তরিত হয়। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (WTC) অনুমান করছে, বর্তমানে প্রায় ২,০০০টি লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। যেখানে একটি ট্রাক ১০-১৩ টন পণ্য বহন করে, একটি লাইটার জাহাজ ১,০০০–৫,০০০ টন বহন করতে পারে, ফলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, মাদার ভেসেল থেকে খালাসের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লাইটার জাহাজকে ছেড়ে যেতে হবে। অনেক জাহাজ ১৫-২০ দিন বা তার বেশি সময় ধরে এটিকে কৌশলগতভাবে স্টক করার জন্য ব্যবহার করছে।
বাজারে প্রভাব চট্টগ্রামের খাটুংগঞ্জ পাইকারী বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে গমের দাম প্রতি মন ১০০–১৫০ টাকা কমেছে। কানাডিয়ান গম বিক্রি হচ্ছে ১,৫৩০ টাকা/মন, আর রাশিয়ান গমের দাম ১,৩৭০ টাকা/মন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু আমদানিকারী লাইটার জাহাজে গম ধরে রাখে দাম বৃদ্ধির আশায়।
বিশেষ অভিযান বৃহস্পতিবারের অভিযানকে সরকার “ভাসমান গুদামে পণ্য স্টক করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি রোধ” হিসেবে বর্ণনা করেছে। অভিযানে জরিমানা হওয়া ৬টি জাহাজের মধ্যে ছিল গাজীপুর লজিস্টিকস ও শিপিং-এর Umme Kulsum। এছাড়াও নিরাপত্তা, লাইসেন্স এবং ফিটনেস সংক্রান্ত নানা অনিয়মের কারণে কয়েকটি অন্যান্য জাহাজকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লাইটার জাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ক্রমবর্ধমান সমস্যা। এটি শুধু বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ঘটায় না, বরং সরকারি নজরদারি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে, যা সাধারণ মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
ড. সালাহ উদ্দিন, অর্থনীতি বিশ্লেষক, বলেন: “এই ধরনের জাহাজ ব্যবহারকারীরা গুদামজাতের মতো চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়তা পায়। ফলে বাজারে মূল্য এবং চাহিদা কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সরকারকে নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর অভিযান চালাতে হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের অভিযান সরকারের পদক্ষেপের ধারাবাহিক অংশ, যা মুদ্রাস্ফীতি ও কৃত্রিম সংকট রোধের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















