জাপানের রাজধানী টোকিওর ব্যস্ত সড়কে যানজট ঠেলে কোনো জরুরি অ্যাম্বুলেন্সকে ছুটতে দেখলে তা কেবল অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় নয়, বরং বিকল হয়ে পড়া কোনো ‘হিউম্যানয়েড রোবট’ দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপনের কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিতে এবার দুর্ঘটনাকবলিত কিংবা কারিগরি ত্রুটিতে অচল হয়ে পড়া মানবরূপী রোবটকে অন-সাইট সেবা দিতে জাপানে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘হিউম্যানয়েড অ্যাম্বুলেন্স’। দেশটির খ্যাতনামা ইন্টারনেটভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘জিএমও ইন্টারনেট গ্রুপ’ (GMO Internet Group) এই অভিনব রক্ষণাবেক্ষণ ভ্যানটি টোকিওর রাস্তায় নামিয়েছে, যার মূল কাজ হলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে নষ্ট রোবট সারাই করা এবং প্রয়োজনে তাত্ক্ষণিক বিকল্প রোবট সরবরাহ করা।
প্রযুক্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘এনগ্যাজেট’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, কোনো স্থানে কাজ করার সময় কোনো হিউম্যানয়েড রোবট আকস্মিকভাবে অকেজো হয়ে পড়লে এই অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত সেখানে গিয়ে হাজির হবে। বিশেষায়িত এই ভ্যানটিতে ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, সারাইয়ের টুল ও একদল দক্ষ প্রকৌশলী সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবেন। ঘটনাস্থলে কোনো রোবট তাৎক্ষণিকভাবে সচল করা সম্ভব না হলে, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা একটি সচল বিকল্প হিউম্যানয়েড রোবটকে তাৎক্ষণিকভাবে ওই স্থানে কাজে বসিয়ে দেওয়া হবে; যাতে সেবাকাজে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে। অন্যদিকে, অচল বা ক্ষতিগ্রস্ত রোবটটিকে অধিকতর মেরামতের উদ্দেশ্যে টোকিওর শিবুয়ায় অবস্থিত ‘জিএমও’-এর নিজস্ব হিউম্যানয়েড ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে টোকিওস্থ জিএমও সদর দপ্তরে আপাতত একটি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হয়েছে। তবে এটি সাধারণ কোনো রোবটের জন্য ব্যবহার করা হবে না; কেবল ‘জিএমও এআই অ্যান্ড রোবোটিকস ট্রেডিং’ বা ‘জিএমও এআইআরও’ (GMO AIRO)-এর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর জন্যই এই জরুরি পরিষেবাটি প্রযোজ্য হবে। পরিস্থিতি ও চাহিদার গুরুত্ব বিবেচনা করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেবে। উদাহরণস্বরূপ, টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে যাত্রীদের ব্যাগেজ বহনের কাজে নিয়োজিত হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ‘জেএএল গ্রাউন্ড সার্ভিস’-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ‘ইউনিট্রি’ (Unitree) কোম্পানির তৈরি এসব মানবরূপী যন্ত্রের মাঠপর্যায়ের ট্রায়াল পরিচালনা করছে জিএমও। এ বিষয়ে ‘জিএমও এআইআর’-এর প্রকৌশলী শৌতা তাকিজাওয়া জানান, আগামী দিনে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার যত ব্যাপক ও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, অন-সাইট সার্ভিস হিসেবে এ জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সেবার প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে।
বিশেষ এই অ্যাম্বুলেন্সটির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবয়বের নকশা তৈরি করেছেন টোকিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্ল্যামারাস’-এর প্রখ্যাত ডিজাইনার ইয়াসুমিচি মোরিতা। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত প্রচলিত জরুরি সেবা গাড়িগুলোর আদলেই এটি সাজানো হয়েছে, যার ছাদে রয়েছে বেগুনি রঙের লাইটবার এবং গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘হিউম্যানয়েড অ্যাম্বুলেন্স’। জিএমও এআইআর-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোমোহিরো উচিদা জানান, অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত রোবটকে দূরবর্তী মেরামত কেন্দ্রে পাঠানোর ফলে দীর্ঘ সময় সেবাকাজ ব্যাহত হতো। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প হিউম্যানয়েড সরবরাহের ধারণাটি বাস্তবায়িত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, জিএমও গ্রুপের মূল ব্যবসায়িক কাঠামো ডোমেইন ও হোস্টিংভিত্তিক হলেও তাদের রোবটিক্স ইউনিটটি নিজেরা রোবট তৈরি না করে অন্যান্য প্রযুক্তি নির্মাতাদের প্রস্তুত করা হার্ডওয়্যার বিক্রি ও পরবর্তীতে সেগুলোর বিক্রয়োত্তর পরিষেবা প্রদান করে থাকে।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে উদীয়মান প্রযুক্তির বাজারে আধিপত্য বিস্তারে গত এপ্রিলে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী এআই রোবটিক্স কৌশল অনুমোদন করেছে জাপান সরকার। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ ৪০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক রোবট বাজারের ৩০ শতাংশেরও বেশি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের রোবটিক্স শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এত বড় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কেবল একটি অ্যাম্বুলেন্স ভ্যান খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবুও ভবিষ্যতে রোবটের সার্বজনীন চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই মাঠপর্যায়ে বাস্তবমুখী সেবা দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে জিএমওর এই ‘হিউম্যানয়েড অ্যাম্বুলেন্স’ উদ্যোগটি নজর কেড়েছে।


























