ইসরায়েলের অবরোধ, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা আর বিশ্ব কূটনীতির সামনে এক কঠিন প্রশ্ন
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যখন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গাজার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে, তখন সংগঠকরা জানতেন এটি কেবল খাদ্য ও ওষুধ বহনের অভিযান নয়। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে এক নৈতিক পরীক্ষা।
অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা
ডজনখানেক নৌযান ও প্রায় পাঁচ শতাধিক অংশগ্রহণকারী নিয়ে ফ্লোটিলা যাত্রা শুরু করে। এদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য, আইনজীবী, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কর্মী গ্রেটা থানবার্গ।
বাংলাদেশি আলোকচিত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম লিখেছিলেন:
“আমরা ভয় পাই না। সামনের বহরে আক্রমণ হলেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। অবরোধ ভাঙবই।”
বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম গাজায় ‘অবরোধ ভাঙার’ অঙ্গীকার করেছেন। ছবি: শহিদুল আলম/ফেসবুক
কিন্তু অক্টোবরের শুরুতেই ইসরায়েলি নৌবাহিনী বহর আটক করে। জাহাজ বাজেয়াপ্ত হয়, অংশগ্রহণকারীরা আটক হন। ইসরায়েল দাবি করে— সহায়তা “নিরাপদ ও অনুমোদিত চ্যানেল দিয়েই” পৌঁছানো উচিত।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড একে আখ্যা দিয়েছেন—
“শান্তিপূর্ণ মানবিক মিশনের উপর নগ্ন আক্রমণ। গাজায় সাধারণ মানুষকে অনাহারে রাখা যুদ্ধাপরাধ।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, অবরোধটি “অবৈধ সমষ্টিগত শাস্তি”— যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
ফ্লোটিলার আটক হওয়া এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছেন।
কিন্তু প্যালেস্টাইনি বিশ্লেষক ডায়ানা বুট্তু বলেছেন: “চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো গ্যারান্টি নেই, সব গ্যারান্টি ইসরায়েলের জন্য।”
ফ্লোটিলা সেই অসঙ্গতিটিই তুলে ধরেছে— খাদ্য ও ওষুধকে যদি রাজনৈতিক শর্তে আবদ্ধ রাখা হয়, তবে তা মানবিক সহায়তা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শহরগুলোতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ।
তুরস্ক ও স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
উচ্চপ্রোফাইল কর্মীদের আটক হওয়ায় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক কাভারেজ পাওয়া গেছে, যা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছে।
প্রতীকের বাইরে বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফ্লোটিলা আসলে এক ধরনের নৈতিক গণভোট—
বিশ্ব কি গাজাকে একটি স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে মেনে নেবে?
নাকি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে বেসামরিক জনগণের অধিকার রক্ষায় চাপ সৃষ্টি করবে?
যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল নিন্দা জানায় আর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ইসরায়েল আরও একবার সফল হবে, আর ট্রাম্পের পরিকল্পনা কার্যত অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু যদি সরকারগুলো শর্তহীন মানবিক সহায়তার দাবি তোলে, তবে ফ্লোটিলা প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
গাজাগামী ত্রাণবহর আটকে দিল ইসরায়েল
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল না শুধু নৌযান বহর। এটি ছিল এক দৃঢ় বার্তা— ক্ষুধার্ত মানুষ রাজনৈতিক আলোচনার অপেক্ষা করতে পারে না।
এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব এই বার্তাকে শোনে কিনা, নাকি আবারও রাজনৈতিক কূটনীতির আড়ালে গাজার মানুষকে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।