চিলির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ভিলা আলেমানার এক ছোট্ট পার্কে যখন কুম্বিয়া সুরে নাচে ভেসে যাচ্ছে বাতাস, তখন সেই অচেনা উৎসবের কেন্দ্রে দাঁড়ানো এক নারী জনতার মন কাড়ছেন। তার নাম জ্যানেট জারা — দেশের প্রেসিডেন্ট পদে অন্যতম শীর্ষ প্রার্থী, আর সেই সঙ্গে এক অনন্য ইতিহাসের মুখ।
চিলিতে ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর এমন জনপ্রিয়তায় কোনো কমিউনিস্ট প্রার্থী জাতীয় নির্বাচনে সামনে আসেননি। তাই জারার প্রার্থীতা শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং অতীতের দমনে হার না মানা এক আদর্শের পুনর্জন্ম।
ভিলা আলেমানার সেই জনসভায় শত শত মানুষ ভিড় করে আছে। বন্ধুরা হাত ধরাধরি করে নাচে, শিশুরা ছুটে বেড়ায় বড়দের মাঝে। নীল জিনস আর সরল ব্লেজারে জারা উঠে দাঁড়ান মঞ্চে। তার কণ্ঠে মেশে শ্রমজীবী মানুষের গল্প, প্রতিশ্রুতি আর স্বপ্ন। তিনি জানান, জনগণের জীবনমান উন্নয়নই তার প্রথম অঙ্গীকার।
জারার উত্থান যেন অচেনা ঢেউ। মার্কিন রাজনীতির উদীয়মান তারকা জোহরান মামদানির সঙ্গেও তাকে তুলনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে দুজনেই নিজেদের অপ্রত্যাশিত জয়ের মাধ্যমে কাঠামোগত রাজনীতির কেন্দ্রীপন্থার বাইরে নতুন এক পথের ইঙ্গিত দেন। জারা ৬০ শতাংশ ভোট পেয়ে শাসক জোট ইউনিটি ফর চিলির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন।
এক জরিপে দেখা যায়, প্রথম দফার ভোটের আগে জারা ২৪.৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। তার পেছনেই রয়েছেন ডানপন্থী নেতা হোসে আন্তোনিও কাস্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, জারার গল্পই তাকে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে। সান্তিয়াগোর দরিদ্র এলাকা কনচালিতে জন্ম নেওয়া এই নারী ছিলেন পিনোশের নির্মম শাসনামলের সন্তান। তখন কমিউনিস্ট পরিচয় ছিল অপরাধ, আর বামপন্থীদের ওপর নেমে এসেছিল রক্তক্ষয়ী নিপীড়ন। দারিদ্র্যের চাপে জারার পরিবার ভেঙে গিয়েছিল। বাবা বিদেশে কাজে চলে যান, মা অন্য শহরে রোজগারের তাগিদে। ছোট্ট জারাকে বড় করেছিলেন তার দাদি।
১৩ বছর বয়সে তিনি মাঠে ফল তুলতেন মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে। পরের বছরই যোগ দেন কমিউনিস্ট ইয়ুথ পার্টিতে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম মিছিলে হাঁটেন। পরবর্তীতে শ্রমিক সংগঠনে কাজ করেন, সরকারি দায়িত্বেও ছিলেন। মিশেল ব্যাশেলের সরকারে তিনি কর্মসংস্থান উপসচিব ছিলেন এবং পরে গ্যাব্রিয়েল বোরিকের মন্ত্রিসভায় শ্রমমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। কাজের সময়সীমা ৪৫ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৪০ ঘণ্টায় আনা এবং পেনশন সংস্কারের মতো পরিবর্তনে তার নেতৃত্ব ছিল মূল চালিকা শক্তি।
জারা নিজেও বলেন, তার শ্রমজীবী শিকড় একসময় তাকে আশঙ্কায় ফেলেছিল যে তিনি হয়তো কখনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন না। এখন তিনি বিশ্বাস করেন, সৎ প্রতিনিধিত্বের জন্যই এমন মানুষদের নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন।
তার সমাবেশে অনেকেই বলেন, জারা তাদের মতো মানুষের ভাষায় কথা বলেন। এক তরুণী শিক্ষার্থী জানালেন, তিনি প্রথমবারের মতো অনুভব করেছেন একজন প্রার্থী তাকে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এক বয়স্ক নারী হাসতে হাসতে বলেন, তিনি জারাকে দেখতেই দূর থেকে ছুটে এসেছেন, কারণ এই নারী কথা বলেন সাধারণ মানুষের মতো।
জারার অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আশার আলো। তিনি ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৭৫০০০০ পেসো করার কথা বলেছেন। চিলির ৬৬ শতাংশ মানুষ ঋণে জর্জরিত, তাই তার প্রতিশ্রুতি অনেকের হৃদয়ে আশা বুনেছে।
তবে সবাই তার প্রতি আস্থাশীল নয়। ডানপন্থী প্রার্থী কাস্টের সমর্থকরা মনে করেন, জারা দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর নিরাপত্তাহীনতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন। অনেকেই অপরাধ ও অভিবাসন নিয়ে ভীত। এই ভয়কেই কাস্ট কঠোর অবস্থান দিয়ে কাজে লাগাচ্ছেন, যেমন সীমান্তে সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মিত অভিবাসীদের বহিষ্কার।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংগঠিত অপরাধ বাড়ছে দেশে। কাস্ট এই সংকটকে জাতীয় জরুরি অবস্থা বলে বর্ণনা করছেন এবং তার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, কঠোর হাতই এই সমস্যার সমাধান।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যদিও জারা সবচেয়ে এগিয়ে, তবুও দ্বিতীয় দফায় গেলে কাস্টের পক্ষে সব ডানপন্থী ভোট এক হতে পারে, যা জারার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বছর প্রথমবারের মতো আবার বাধ্যতামূলক ভোট ফিরেছে, যা নির্বাচনে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবু ভিলা আলেমানায় জারার সমাবেশ ছিল উদযাপনের মতো। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রাজনীতি শুধু বক্তৃতা নয়, মানুষের কথা শোনা—সেটাই তাকে পথ দেখাবে।
জারার কথা যেন এক দীর্ঘদিনের নীরব মানুষের স্বপ্ন। তিনি আশা করেন, সবসময় জনগণের সঙ্গে থাকবেন, কথার আড়ালে নয়, বাস্তবতায়।
















