অধ্যাপক ইউনূস তাঁর ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ এবং সংস্কারমূলক কাজে অর্জিত অগ্রগতি তুলে ধরেন।
১. অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি প্রধান দায়িত্ব
ড. ইউনূস স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের সরকারের ওপর মূলত তিনটি গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত ছিল:
- হত্যাকাণ্ডের বিচার: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
- গণতান্ত্রিক সংস্কার: জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের আয়োজন করা।
- ক্ষমতা হস্তান্তর: সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
২. বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: জুলাই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মামলার প্রথম রায় শীঘ্রই দেওয়া হবে। আরও কয়েকটি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
- অন্যান্য আদালত: সাধারণ ফৌজদারি আদালতগুলোতেও জুলাই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত কিছু বিচারকাজ শুরু হয়েছে।
- গুমের বিচার: দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গুমের মতো নৃশংস অপরাধের বিচারকাজ শুরু করা হয়েছে।
৩. সংস্কারমূলক অর্জন
- অধ্যাদেশ বা বিদ্যমান আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে:
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।
- আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা।
- প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ।
- আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে সুশাসনের জন্য এই সংস্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং আগামী নির্বাচিত সরকার সংসদে আলোচনার মাধ্যমে তা গ্রহণ করবে।
৪. সুষ্ঠু নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর
- প্রধান উপদেষ্টা পুনরায় ঘোষণা করেন যে, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
- এই নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য সরকার সব প্রস্তুতি নিচ্ছে।
৫. জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও জুলাই সনদ
- ঐকমত্য কমিশনের সাফল্য: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিরলসভাবে প্রায় নয় মাস কাজ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছে।
- ঐতিহাসিক অর্জন: ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধান বিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যা একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
- ভিন্নমত: কিছু বিষয়ে সামান্য ভিন্নমত থাকলেও, প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন মতভিন্নতা খুব গভীর নয়; মূলত সংস্কারটি সংবিধানে নাকি আইনের মাধ্যমে হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।
৬. জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন
উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করা হয়েছে। এই আদেশে সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবণার ওপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
ঐক্যের প্রতি আহ্বান
ভাষণের শেষে প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলিকে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লঘু বিবাদে না জড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন যে, তা না হলে জাতি এক মহাবিপদের সম্মুখীন হতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতি একটি উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং নতুন বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।
















