আমেরিকার রাজনীতিতে আবারও ঝড় তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কনীতি। একদিকে দেশের ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন উঠেছে— প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই এই ক্ষমতা রাখেন?
ওয়াশিংটন ডিসির সর্বোচ্চ আদালতে বুধবার প্রায় তিন ঘণ্টার শুনানিতে রক্ষণশীল ও উদারপন্থী বিচারপতিরা ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্ক আরোপের বৈধতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন। এই নীতিই এখন মার্কিন অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিশ্ব বাণিজ্যের গতিপথ পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে।
ট্রাম্পের প্রশাসনের আইনজীবী ডি জন সাওয়ার যুক্তি দেন, প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন অনুসারে শুল্ক আরোপ করেছেন, যা বিদেশি হুমকি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টকে বিশেষ অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেয়।
তিনি বলেন, “আমাদের বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিপর্যয় ডেকে আনছে, তাই এই শুল্ক আরোপ জরুরি।”
কিন্তু ছোট ব্যবসাগুলোর পক্ষে যুক্তি দেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আইনজীবী নিল কাটিয়াল। তার বক্তব্য, “শুল্ক মানেই কর, আর মার্কিন সংবিধান কর আরোপের ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসকে দিয়েছে, প্রেসিডেন্টকে নয়।”
শুনানিতে বিচারপতিরা একের পর এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, “আইইইপিএ আইনে কোথাও ‘শুল্ক’ শব্দটি নেই।” উদার বিচারপতি এলেনা কাগান যোগ করেন, “এই আইনে অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু আপনি যা করতে চাইছেন, তা নয়।”
এমনকি ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেটও প্রশ্ন করেন, “প্রত্যেক দেশকে কি সত্যিই শুল্কের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল? স্পেন, ফ্রান্স— এদেরও?”
লিবারেল বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র বলেন, “আপনি বলতে চান শুল্ক কর নয়, কিন্তু সেটাই তো কর।”
কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষে পর্যন্ত এই শুল্ক থেকে মার্কিন কোষাগারে প্রবাহিত হয়েছে প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতি রবার্টস ইঙ্গিত দেন, আদালত হয়তো “মেজর কোয়েশ্চন ডকট্রিন” প্রয়োগ করতে পারে— যা প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে এবং বড় নীতিগত সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের অনুমোদন চায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার রায় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ও ভবিষ্যতের মার্কিন নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রিটেনভিত্তিক চিন্তাশীল প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ম্যাক্স ইয়োয়েলি এক প্রতিবেদনে লেখেন, “সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাগ্য যেমন নির্ধারণ করবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রশাসনগুলোর জন্যও এক নজির হয়ে থাকবে।”
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ওয়াশিংটন শাখার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পেনি নাস বলেন, “এই রায় হবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ আদালতের প্রথম প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ। এক বছর ধরে সীমা পরীক্ষা করার পর, ট্রাম্প এখন দেখবেন সেই সীমারেখা কেমন।”
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনজীবী শান্তনু সিং মনে করেন, এই মামলার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও বিশাল হতে পারে।
তিনি বলেন, “ট্রাম্প এই শুল্ককে ব্যবহার করেছিলেন বিদেশি বাণিজ্য চুক্তির হাতিয়ার হিসেবে। অনেক দেশকে এই চাপের মুখে সমঝোতায় আসতে হয়েছে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেছে, যার শর্তে ইউরোপকে ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি কিনতে এবং ইস্পাতের ওপর শুল্ক কমাতে হয়েছে।
তবে যদি আদালত ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে, সিংয়ের মতে, “তাহলে এই চুক্তিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
ট্রাম্পের প্রশাসন অবশ্য আশাবাদী। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, “প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য আইনজীবীরা খুবই শক্তিশালী যুক্তি দিয়েছেন।”
তবে যদি আদালত রায় দেয় ট্রাম্পের শুল্ক অবৈধ, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে— ইতিমধ্যেই সংগৃহীত কোটি কোটি ডলারের শুল্ক কি ফেরত দিতে হবে? ব্যবসাগুলো কি ক্ষতিপূরণ পাবে?
আইনজীবী নিল কাটিয়াল বলেন, “এটি জটিল হবে, তবে ব্যবসাগুলোর টাকা ফেরত পাওয়া উচিত।” বিচারপতি ব্যারেট হেসে বলেন, “তাহলে তো পুরো প্রক্রিয়াটাই এক বিশৃঙ্খলা হয়ে যাবে।”
ট্রাম্প এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকেই পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপ করেছেন। ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ওপর ১০ শতাংশ, এবং পেটেন্ট ওষুধে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসিয়েছেন।
অর্থনৈতিকভাবে, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট মডেল অনুসারে, ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই শুল্ক থেকে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ২২৩.৯ বিলিয়ন ডলার। তবে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাব জানিয়েছে, এই শুল্ক মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অন্তত অর্ধ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, এখনো পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শুল্কের প্রভাব সীমিত, তবে তাদের সতর্কবার্তা— “এই স্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।”
এখন প্রশ্ন একটাই— সুপ্রিম কোর্ট যদি ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে কি থামবে এই বাণিজ্য যুদ্ধ, নাকি নতুন নামে আবার ফিরে আসবে?
















