ইসরায়েল আবারও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে, যেগুলো তারা দাবি করছে হিজবুল্লাহর সামরিক ঘাঁটিতে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এক বছরের যুদ্ধবিরতির চুক্তি উপেক্ষা করে এমন আগ্রাসী পদক্ষেপে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সীমান্ত এলাকা।
বৃহস্পতিবার ভোরে টাইর অঞ্চলে প্রথম দফার হামলার পরপরই ইসরায়েলি ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান টানা বোমা বর্ষণ চালায় টোরা, আাব্বাসিয়েহ ও তায়বেহ এলাকায়। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ নিশ্চিত করেছে এসব হামলার খবর, যদিও এখনো কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ আকাশেও নিচু উচ্চতায় উড়তে দেখা গেছে ইসরায়েলি বিমান।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর নির্মাণ ইউনিটের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং এমন অভিযান অব্যাহত রাখবে যতক্ষণ না দেশের সীমানা “নিরাপদ” হয়। কিন্তু হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না এবং এই আগ্রাসনের মুখে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
হিজবুল্লাহর ভাষ্য, “আমরা আমাদের বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করছি, কারণ শত্রু আমাদের দেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে এবং তার হামলা থামায়নি।” তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় বসা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও মিশরের চাপের মুখেও সংগঠনটি সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, যিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত, গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে ইসরায়েল লেবাননে আরও বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল ক্যাটজও জানান, উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে “সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ” করা হবে।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তার সরকার সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে, তবে হিজবুল্লাহ একে “অবিবেচনাপ্রসূত” ও “বিপজ্জনক” পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সেনারা সীমান্ত অতিক্রম করে এক রাতের অভিযানে এক লেবানিজ পৌর কর্মীকে হত্যা করার পর প্রেসিডেন্ট আউন লেবানন সেনাবাহিনীকে যেকোনো অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।
এক বছরের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের অন্তত পাঁচটি এলাকায় সেনা মোতায়েন রেখেছে এবং নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তারা দাবি করছে হিজবুল্লাহর ঘাঁটির ওপর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ লেবাননের সেনাবাহিনীকে দক্ষিণে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করছে নিজের দখল বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে—এমন অভিযোগ করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি জানিয়েছে, যতদিন ইসরায়েল লেবাননের ভূমিতে আক্রমণ ও দখল অব্যাহত রাখবে, ততদিন তারা অস্ত্র নামাবে না।
সীমান্তের আকাশে এখন বারুদের গন্ধ, মাটিতে তীব্র উত্তেজনা। লেবাননের দক্ষিণ গ্রামগুলোতে ধোঁয়া, কান্না ও প্রতিশোধের প্রতিধ্বনি মিশে গেছে এক বিষণ্ন সকালের বাতাসে—যেখানে শান্তি আজও কেবল এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি।
















