তেহরান যেন এখন এক দ্বিধার শহর— পুরনো কঠোরতার শেকল ভাঙতে চায় কেউ কেউ, আবার অন্যরা সেই শেকলকে আরও টানটান করে ধরে রাখতে চায়। যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি, কিন্তু সমাজে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়েছে— স্বাধীনতা বনাম নিয়ন্ত্রণের।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান গত মাসে ঘোষণা দেন এক “জেনারেশন জেড উপদেষ্টা”-র। তরুণ আমিররেজা আহমাদি হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। আহমাদি ঘোষণা দেন, তিনি দেশের তরুণদের কথা শুনবেন— “তেহরান থেকে সীমান্ত পর্যন্ত”— এমনকি নিজের মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করেন।
কিন্তু দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে তাকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেক তরুণ অভিযোগ করেন, আহমাদি প্রকৃত তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি নন, ভুয়া অনুসারী বাড়িয়ে তিনি জনপ্রিয়তার ভান তৈরি করছেন। ফলে তাকে ঘিরে সরকারের প্রচেষ্টা কিছুটা ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থী সরকার নির্বাচনের সময় যে সামাজিক স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখন বাস্তবায়নের লড়াইয়ে হোঁচট খাচ্ছে। তরুণ সমাজের অনেকেই এই উদ্যোগে উদাসীন, আর সরকারব্যবস্থার রক্ষণশীল গোষ্ঠী তা মেনে নিতে নারাজ।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, “ইরানি রাষ্ট্র এখন এমন এক প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করছে, যারা বেড়ে উঠেছে অনলাইনে, আর যারা রাষ্ট্রের আদর্শিক ভাষা বোঝে না।” তার মতে, এই সংযোগ প্রচেষ্টা আন্তরিক নয়, বরং বিদ্রোহ ঠেকানোর একটি কৌশল মাত্র।
ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর থেকে ইরানের অভ্যন্তরে এক নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক মন্দা ও যুদ্ধের আশঙ্কা— সব মিলিয়ে সরকার বুঝছে, জনগণের সমর্থন ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন। তাই কিছু কর্মকর্তা এখন সামাজিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পক্ষপাতী।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সম্প্রতি কঠোরপন্থী সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করে বলেন, জনগণের মতের বিরুদ্ধে আইন চাপিয়ে দেওয়া দেশের জন্য বিপজ্জনক। তার মন্তব্যে অনেকে বাধ্যতামূলক হিজাব ইস্যুর প্রতি ইঙ্গিত দেখেছেন। সরকার জানিয়েছে, এই আইন তারা জোর করে প্রয়োগ করবে না।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রাজধানী তেহরানের রাস্তায় তরুণদের এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ ব্যান্ডের এক সদস্যের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, অভিযোগ— “অপরাধমূলক বিষয়বস্তু প্রকাশ”।
অন্য এক ঘটনায়, পাকদাশত এলাকায় “নগ্ন নারী ও তরুণদের নিয়ে ডিস্কো আয়োজনের” অভিযোগে কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয় এবং আয়োজকদের বিরুদ্ধে মামলা করে।
এ যেন ইরানের এক অদ্ভুত সময়— যুদ্ধোত্তর শান্তির মধ্যে অস্থিরতা, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ভয়ের ছায়া। কেউ চায় মুক্ত হাওয়া, কেউ চায় নিয়ন্ত্রণের প্রাচীর অটুট থাকুক। আর তেহরানের রাস্তায়, তরুণদের চোখে, যেন ফুটে উঠছে সেই অনন্ত প্রশ্ন— ইরান কি কখনও সত্যিই বদলাবে?
















