রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরের একই দুই মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এই সময়ে কাঁচা পাটের রপ্তানি ৩৬ শতাংশ, পাটের সুতা ৫৮ শতাংশ এবং অন্যান্য বহুমুখী পাটপণ্যের আয় ৪৮ শতাংশের বেশি বাড়লেও পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি থেকে আয় কিছুটা কমেছে। মূলত বিশ্ববাজারে গৃহসজ্জার সামগ্রী, শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, প্যাকেজিং এবং পাটকাঠির চারকোলসহ বিভিন্ন পাটপণ্যের চাহিদার ধারাবাহিকতা এই প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং পাট খাতের সুদিন ফেরাতে এবার কোনো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য না ধরে পাঁচ বছরের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ‘বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-৩১)’ শীর্ষক এই খসড়ার মূল লক্ষ্য হলো আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের বার্ষিক রপ্তানি আয় বর্তমানের ৮২ কোটি ডলার থেকে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করা। একই সঙ্গে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১১৫ থেকে ১২০ লাখ বেলে উন্নীত করা, দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পাটবীজের চাহিদা পূরণ এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের অংশ ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিগত বছরগুলোতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বহু পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গত বছর বন্যায় পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মূলত অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে পরিমাণের দিক থেকে রপ্তানি সেভাবে বাড়েনি। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিকসহ সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা উল্লেখ করেছেন যে, শুধু দাম বাড়ার কারণে রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যান কিছুটা বেশি দেখালেও কাঠামোগত ও উৎপাদনজনিত নানা সংকট এখনও কাটেনি। কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা মসৃণ না করা গেলে এবং বন্ধ থাকা মিলগুলোকে কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ না নিলে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, কারণ উচ্চ জ্বালানি মূল্যের ফলে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি কাঁচা পাটের উচ্চ মূল্যের ফলে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের ব্যয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তা সত্ত্বেও গৃহসজ্জা, অটোমোবাইল, গার্ডেনিং ও প্যাকেজিং খাতে পাটপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে।
পাট খাতের অপার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও গবেষণার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল করিমসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বিডা-র প্রাক্কলন অনুযায়ী রপ্তানি আয় পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গবেষণার পাশাপাশি এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বাসিরও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, এই পাঁচ বছরের পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পাট খাত থেকে দুই বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় অর্জন করা সম্ভব হবে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।


























