দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানের আকাশে অক্টোবরের হালকা আলো। হাত মেলালেন দুই পরাশক্তির নেতা—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বহু মাসের টানটান উত্তেজনা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যযুদ্ধের কুয়াশা যেন এক মুহূর্তে কিছুটা সরে গেল।
এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (এপেক) সম্মেলনের আঙিনায় বৃহস্পতিবার দুই নেতা এক বছরের জন্য বাণিজ্য বিরোধে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে বসে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, আপাতত আর কেউ কারও দিকে বাণিজ্যিক অস্ত্র তাক করবে না।
ট্রাম্প বলেন, “এটি এক অসাধারণ বৈঠক। বিরল মাটির খনিজ নিয়ে সমস্যা এখন সমাধান হয়েছে।” তার ভাষায়, “এই শব্দটা কিছুদিনের জন্য আমাদের অভিধান থেকে মুছে যাবে।” প্রায় দুই ঘণ্টার আলোচনার শেষে তিনি ঘোষণা করেন, এই চুক্তি প্রতিবছর পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, চীন আপাতত বিরল মাটির খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ স্থগিত রাখবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে। একই সঙ্গে ফেন্টানিল সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনবেন ট্রাম্প, বিনিময়ে শি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মারণাত্মক এই সিনথেটিক মাদকের প্রবাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপের।
“আমি বিশ্বাস করি, তিনি সত্যিই কাজ করবেন—এই মৃত্যুর স্রোত থামাতে,” দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বললেন ট্রাম্প।
শি জিনপিং মন্তব্য করলেন, “আমরা পারস্পরিক সমস্যাগুলো সমাধানের পথে এক ঐকমত্যে পৌঁছেছি।” তিনি আরও জানান, “উভয় দেশই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে বিশ্ব অর্থনীতি আশ্বস্ত হয়।”
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও চুক্তির কয়েকটি দিক নিশ্চিত করেছে—বিরল মাটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এক বছরের জন্য স্থগিত থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি-সম্পর্কিত রপ্তানি সীমাবদ্ধতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত করবে, আর উভয় দেশ পারস্পরিক বন্দর শুল্কও বাতিল করবে।
তবু বাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল নিস্তেজ। হংকং, সাংহাই ও সিডনির সূচকগুলো সামান্য নিচে নেমেছে, জাপান প্রায় স্থিতিশীল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি বড় কোনো পরিবর্তন নয়, বরং “একটি সাময়িক বিরতি”।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিস ওয়াইল্ডার মন্তব্য করেন, “উভয় পক্ষই তাদের অস্ত্র নামায়নি—তারা শুধু কিছুদিনের জন্য গুলি চালানো বন্ধ করেছে।”
চীনের বিরল মাটির খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে নাড়িয়ে দিতে পারত। কারণ, পৃথিবীর এই গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর প্রায় পুরো জোগানই আসে চীনের হাত থেকে—যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত সবকিছুতেই অপরিহার্য।
সাংহাই-ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হুতং রিসার্চের অংশীদার শান গুয়ো বলেন, “ফেন্টানিল শুল্ক কমানো চীন অনেক দিন ধরেই চাচ্ছিল। এবার তারা বিরল মাটির ইস্যুকে কৌশলে ব্যবহার করে সেটি আদায় করেছে।”
তবে তিনি যোগ করেন, “২০ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ হ্রাস—মানে যুক্তরাষ্ট্র এখনও কিছুটা চাপ ধরে রাখছে, ভবিষ্যতের আলোচনার সুবিধার জন্য।”
অন্যদিকে, হিনরিখ ফাউন্ডেশনের ট্রেড পলিসি প্রধান ডেবোরা এলমস একে বলেছেন, “বাণিজ্যযুদ্ধের একটি আংশিক স্থবিরতা, সামান্য পিছিয়ে আসা।”
টিডালওয়েভ সলিউশনসের পার্টনার ক্যামেরন জনসন বললেন, “এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের যা করার ছিল, সম্ভবত এটিই সর্বোত্তম। অন্তত এখনই সম্পর্ক আর খারাপের দিকে যাবে না।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যেহেতু এই চুক্তি প্রতিবছর পুনর্বিবেচিত হবে, তাই দুই দেশই প্রতি বছর তাদের সম্পর্ক ও প্রভাবের মাপকাঠি নতুন করে নির্ধারণ করবে।”
বুসানের সেই দৃশ্য—যেখানে দুই নেতা বিদায়ের আগে হাত মেলালেন—সম্ভবত ইতিহাসে রয়ে যাবে এক মুহূর্ত হিসেবে, যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কঠিন বরফের ভেতর দিয়ে একফোঁটা উষ্ণতা ঝরে পড়েছিল।
















