সুদানের জ্বলন্ত আকাশ আবারও সাক্ষী হলো নতুন মৃত্যুর, নতুন ধ্বংসের। উত্তর দারফুরের এল-ফাশের এবং উত্তর কোরদোফানের বারা শহরে তীব্র লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছে সরকারি সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ)। গৃহযুদ্ধের এই রক্তাক্ত অধ্যায় যেন থামার কোনো নাম নিচ্ছে না।
শনিবার ভোরে রাজধানী খারতুম থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের বারা শহরে আরএসএফ বহু দিক থেকে আক্রমণ চালায়। শহরজুড়ে শুরু হয় তীব্র গোলাগুলি ও আর্টিলারি হামলা। সেনাবাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, এই আকস্মিক হামলার জবাবে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী।
বারা শহরটি পশ্চিম ফ্রন্টে সেনাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বৃহত্তম নগরগুলোর একটি হলেও এখন সেটি প্রায় পুরোপুরি ঘেরাও অবস্থায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নীরব আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে সর্বত্র।
অন্যদিকে এল-ফাশেরেও চলছে লাগাতার সংঘর্ষ। শহরের ওপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী, আকাশজুড়ে গোলাবর্ষণের গর্জন। শুক্রবার রাতে আরএসএফ দাবি করেছে, তারা উত্তর দারফুরের গভর্নরের বাসভবন দখল করেছে এবং এখন সেনাবাহিনীর ৬ষ্ঠ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। তাদের যোদ্ধারা জানিয়েছে, তারা শহরের কেন্দ্রভাগে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে শহরে কিছুটা শান্তি ফিরলেও গুলিবর্ষণ এখনও চলছে। এল-ফাশেরের এক বাসিন্দা জানান, “বিস্ফোরণ হচ্ছে সর্বত্র, আমার বাড়ির কাছেই একটি শেল পড়েছে—মাত্র একশ মিটার দূরে।”
মানবিক বিপর্যয় এখন সীমা ছাড়িয়েছে। সুদান ডক্টর্স নেটওয়ার্কের মুখপাত্র ডা. রাজান আল-মাহদি বলেন, “এল-ফাশেরের পরিস্থিতি মানবতার সীমা অতিক্রম করেছে। প্রতিদিন আমরা কমপক্ষে তিনটি শিশুকে হারাচ্ছি অপুষ্টি, রোগ এবং চিকিৎসার অভাবে।”
জাতিসংঘের চারটি সংস্থা সম্প্রতি সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রায় আড়াই লাখ মানুষ—যার অর্ধেকই শিশু—১৬ মাস ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা নেই। হাজারো শিশু মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত, চিকিৎসকরা অসহায়।
শিশু অধিকার সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, শুধু অক্টোবর মাসেই এল-ফাশেরে ১৭ শিশু নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছে। শহরজুড়ে ক্ষুধা ও আতঙ্কের রাজত্ব।
বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে আরএসএফ পাঁচ দিক থেকে ব্যাপক আক্রমণ চালায়, যা সেনাবাহিনী প্রতিহত করার দাবি করেছে। কিন্তু শহরের আকাশে যে ধোঁয়া ভাসছে, তা জানায়—যুদ্ধ থামেনি, শুধু আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এদিকে, ড্রোন হামলার কারণে নতুন করে বিপর্যয় নেমে এসেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ রাধুয়ানে নুইসার জানিয়েছেন, উভয় পক্ষই এখন ড্রোন ব্যবহার করছে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর। মঙ্গলবারের এক হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়, আহত হন ছয়জন কর্মী।
খারতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা সেনাবাহিনী মার্চে পুনর্দখল করেছিল, টানা চতুর্থ দিনের মতো আরএসএফ ড্রোন হামলায় আক্রান্ত হয় শুক্রবার। বিমানবন্দর পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত।
এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের এপ্রিলে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়েছে, ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, আর ৩ কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার অপেক্ষায়—বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে এটি।
বিদেশমন্ত্রী মোহিয়েলদিন সালেম সপ্তাহান্তে ওয়াশিংটন সফরে গেছেন শান্তি ও মানবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য। তবে, সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে কোনো পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলে যে গুজব উঠেছিল, তা অস্বীকার করেছে সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন যে তিনি সুদানের যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা নেবেন। কিন্তু বর্তমানে তার পররাষ্ট্রনীতি মূলত গাজা উপত্যকায় অস্ত্রবিরতি রক্ষা ও ইউক্রেন যুদ্ধের মীমাংসার দিকে কেন্দ্রীভূত থাকায়, সুদান আপাতত অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশের মানুষ এখন এক অনন্ত অন্ধকারে বেঁচে আছে। তাদের মাথার ওপর অবিরাম বিস্ফোরণ, নিচে ক্ষুধা ও রোগের দংশন। তবুও হয়তো কারও চোখে একটুখানি আলো—শান্তির প্রার্থনা, মানবতার আবেদন।
















