কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রেমের কবিতা লিখতে পারে, সঙ্গীসুলভ কথোপকথন চালাতে পারে, এমনকি অনেক ব্যবহারকারী তাদের প্রতি রোমান্টিক অনুভূতিও গড়ে তুলছেন। কানাডার এক ব্যক্তি একটি ভার্চুয়াল অবতারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক তরুণী স্বীকার করেছেন একটি চ্যাটবটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর কথা। জনপ্রিয় এআই সঙ্গী অ্যাপগুলোর লাখো ব্যবহারকারীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের ‘রোমান্টিক সম্পর্কে’ আছেন বলে দাবি করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অনুভূতি একপাক্ষিক। চ্যাটবটের প্রতিক্রিয়া মূলত অ্যালগরিদমভিত্তিক লেখা—যা মানুষের আবেগ অনুকরণ করে, কিন্তু নিজে কিছু অনুভব করে না। সিঙ্গাপুরের এক গবেষকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা আবেগগতভাবে যুক্ত হলেও যখন যন্ত্র হঠাৎ থেমে যায় বা ভুল করে, তখনই তারা বুঝতে পারেন এটি কেবল একটি মেশিন। এতে অনেকেই মানসিক আঘাত পান।
ভালোবাসা আসলে কী? বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোমান্টিক প্রেম মানুষের দেহ ও মস্তিষ্কের জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশার প্রেমকে তিনটি স্বতন্ত্র তাড়নায় ব্যাখ্যা করেছেন—কাম, আকর্ষণ ও আসক্তি। ডোপামিন উত্তেজনা সৃষ্টি করে, অক্সিটোসিন দীর্ঘমেয়াদি বন্ধন গড়ে তোলে। প্রেমে পড়লে মস্তিষ্কের আনন্দকেন্দ্র সক্রিয় হয়, স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলোও তৎপর হয়ে ওঠে। অনেক সময় প্রিয়জনকে ঘিরে অতিরিক্ত চিন্তা আমাদের অন্যান্য মানসিক সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
দর্শন ও জ্ঞানবিজ্ঞান গবেষকদের মতে, সত্যিকারের ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন চেতনা—নিজস্ব অনুভব, উপলব্ধি ও মানসিক অভিজ্ঞতা। বর্তমানে ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থায় সে ধরনের আত্মসচেতনতা নেই। কেউ কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতে স্নায়ুতন্ত্রের আদলে তৈরি প্রযুক্তি উন্নত হলে সীমিত মাত্রায় চেতনার মতো বৈশিষ্ট্য অর্জন সম্ভব হতে পারে। তবে এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক পথনির্দেশনা নেই।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, এআই কি বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষার মতো মানসিক অবস্থা ধারণ করতে পারে? গবেষকদের মধ্যে এ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, দেহ ও বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ চেতনা গড়ে ওঠা কঠিন। অধিকাংশ বর্তমান এআইয়ের কোনো শারীরিক অস্তিত্ব নেই, যা মানুষের আবেগীয় অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমালোচকদের মতে, রোমান্টিক সাড়া দেওয়ার মতো করে চ্যাটবট নকশা করা অনেক সময় ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কৌশল। এতে মানুষ সাময়িক সান্ত্বনা পেতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাস্তব সম্পর্ক গড়ার দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানবিক সম্পর্কের জটিলতা এড়িয়ে যন্ত্রের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়লে সামাজিক যোগাযোগের সক্ষমতা কমার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমান প্রযুক্তিতে যন্ত্র মানুষের মতো করে ভালোবাসতে পারে না। ভবিষ্যতে যদি কখনো কৃত্রিম চেতনার উদ্ভব হয়ও, সেই ভালোবাসা মানুষের ভালোবাসার মতো হবে না। প্রশ্নটি তাই প্রযুক্তিগত যেমন, তেমনি দার্শনিকও—ভালোবাসা কি কেবল রাসায়নিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়া, নাকি তার ভেতরে এমন কিছু আছে যা এখনো যন্ত্রের নাগালের বাইরে?
















