হংকংয়ের প্রখ্যাত গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়াকে কার্যত মৃত্যুদণ্ডের সমান বলে মন্তব্য করেছেন তার ছেলে সেবাস্তিয়ান লাই। ব্রিটিশ নাগরিক ৭৮ বছর বয়সী লাইয়ের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আনা অভিযোগে গত ডিসেম্বরে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সোমবার এই সাজা ঘোষণা করা হয়, যা হংকংয়ে এই আইনের আওতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর শাস্তি।
জিমি লাই ছিলেন বেইজিংয়ের কড়া সমালোচক এবং তার গণতন্ত্রপন্থী পত্রিকা অ্যাপল ডেইলিকে তিনি দীর্ঘদিন প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
লাইয়ের ছেলে সেবাস্তিয়ান লাই বিবিসিকে বলেন, তার বাবা মূলত হংকংয়ের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্যই শাস্তি পাচ্ছেন। তার ভাষায়, বয়স ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে এই দীর্ঘ কারাবাস তার বাবার জন্য প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর সমান।
তিনি বলেন, একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে তার বাবা ন্যায্য আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। তার মতে, যিনি আজীবন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তিনি অন্তত জীবনের শেষ প্রান্তে কিছুটা স্বাধীনতা পাওয়ার দাবিদার।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, লাইয়ের মুক্তির বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্রুত ও আরও সক্রিয়ভাবে আলোচনা করবে ব্রিটিশ সরকার। তিনি এক বিবৃতিতে হংকং কর্তৃপক্ষকে মানবিক কারণে লাইকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, যুক্তরাজ্য হংকংয়ের জনগণের পাশে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সাজাকে অন্যায্য ও দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়ে লাইকে মানবিক বিবেচনায় মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এই রায় প্রমাণ করে যে বেইজিং হংকংয়ে মৌলিক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা মানুষদের চুপ করাতে চরম পথ বেছে নিতে প্রস্তুত।
গণতন্ত্রপন্থীদের কাছে নায়ক হিসেবে বিবেচিত জিমি লাইকে বেইজিং বরাবরই রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে দেখেছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তার মুক্তির দাবি জানিয়ে এলেও চীন ও হংকং কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২০ সালে হংকংয়ে ব্যাপক গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পর চীন বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইন চালু করে। এই আইনে বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসবাদ ও বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। একই সঙ্গে কিছু মামলার বিচার মূল ভূখণ্ড চীনে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই আইনের আওতায় লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ ও রাষ্ট্রদ্রোহী প্রকাশনার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের মতে, তিনি তার বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকাকে ব্যবহার করে হংকং ও চীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে বিদেশি সরকারগুলোর কাছে তদবির করেছিলেন।
গত পাঁচ বছর ধরে জিমি লাই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে একাকী বন্দিত্বে রয়েছেন। তার ছেলে জানান, এই দীর্ঘ একাকী আটকাবস্থা তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন তিনি এবং গত এক বছরে তার ওজন প্রায় ১০ কেজি কমে গেছে।
গত মাসে বেইজিং সফরের সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লাইয়ের মুক্তির বিষয়টি তুলেছিলেন বলে জানান। তার ভাষায়, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি মতবিরোধের বিষয়গুলো নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করাই কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্দেশ্য।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন লাইয়ের কারাবাসকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের নেতারা সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে বলছেন, লাইয়ের মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার লজ্জিত হওয়া উচিত।
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মামলায় নেওয়া সব পদক্ষেপ আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত এবং এ নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
















