আপনার প্রিয় কেউ যদি হঠাৎ মারা যান, আপনি কি তার সঙ্গে কথা বলা চালিয়ে যেতে চাইবেন? স্মৃতি বা পুরোনো বার্তা পড়ে নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে—একটি চ্যাটবট, যা তার লেখা বার্তা, ইমেইল বা কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে ঠিক তার মতো করে উত্তর দেবে।
এমন প্রযুক্তি এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। ‘ডিজিটাল আফটারলাইফ’ নামে পরিচিত এই খাতে ইতোমধ্যেই বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যার বাজারমূল্য একশ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি। শোক সামলাতে অনেকে এই সেবার দিকে ঝুঁকছেন।
কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেনি কিড সম্প্রতি এআই-ভিত্তিক ‘ডেথবট’ নিয়ে একটি গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত একটি জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণাকে তিনি বর্ণনা করেছেন একই সঙ্গে ‘আকর্ষণীয় ও অস্বস্তিকর’ হিসেবে।
মৃত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। অতীতে আত্মা ডাকা বা মাধ্যমের মাধ্যমে যোগাযোগের চর্চা ছিল। তবে আধুনিক প্রযুক্তি সেই ধারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও ব্যাপক আকারে উপস্থাপন করছে।
২০২৪ সালে এক ব্যক্তি তার মরণাপন্ন বাবার কণ্ঠ রেকর্ড করে একটি এআই চ্যাটবট তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এতে বাবার স্মৃতি ধরে রাখা সহজ হয়েছে, যদিও এতে শোক পুরোপুরি দূর হয়নি।
তবে শোক সহায়তা নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থা জানিয়েছে, এখনো এই ধরনের ডেথবট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। মানুষের মধ্যে মূলত কৌতূহলই বেশি। সংস্থাটির মতে, এসব এআই টুল যে তথ্য দেওয়া হয়, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শোক যেমন সময়ের সঙ্গে বদলায়, এআই তেমনভাবে বদলাতে পারে না। কারও জন্য এটি সাময়িক সহায়তা হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সমাধান নয়।
ড. জেনি কিড ও তার সহকর্মীরা চারটি বাণিজ্যিক ডেথবট প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষা করেন। তারা দেখেন, এই প্রযুক্তি মৃত মানুষের কণ্ঠস্বর, ভাষার ধরন ও ব্যক্তিত্ব অনুকরণ করার চেষ্টা করে তাদের ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু এতে স্মৃতি, পরিচয় ও সম্পর্ককে খুব সরলভাবে উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণার অংশ হিসেবে ড. কিড নিজেকেই একটি ডেথবটে রূপান্তর করেন। অভিজ্ঞতাটি তার কাছে ছিল অদ্ভুত ও কিছুটা হতাশাজনক। তিনি বলেন, তৈরি হওয়া কণ্ঠস্বরটি তার মতো শোনায়নি, বরং অস্ট্রেলীয় উচ্চারণের মতো লেগেছে।
তার মতে, প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে, তবে এই খাতে বড় বাজার তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। কারণ মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের আগে থেকেই নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি রয়েছে।
নিজেদের মৃত্যুর পর পরিবার সদস্যরা ডিজিটালি তাদের পুনর্গঠন করলে কেমন লাগবে—এই প্রশ্নে গবেষকদের মত এক নয়। ড. কিড বলেন, যদি এটি হালকা বা স্মৃতিচারণার পর্যায়ে থাকে, সমস্যা নেই। কিন্তু যদি ভবিষ্যতে সেই ডিজিটাল সত্তা এমন কথা বলে বা অবস্থান নেয়, যা তিনি কখনো নিতেন না, তাহলে তা তার স্মৃতিকে বিকৃত করতে পারে।
অন্য এক গবেষক বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তার মতে, যদি এতে পরিবার উপকৃত হয়, তাহলে আপত্তি নেই। তবে এটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার ঝুঁকি আছে, আর এমন সেবার পেছনে অর্থ ব্যয় করা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও জটিল প্রশ্ন।
গবেষকদের মতে, এআই ডেথবট প্রযুক্তি শোক ও স্মৃতির জগতে নতুন প্রশ্ন তুলছে—যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি নৈতিক ও মানবিক জটিলতাও সামনে আনছে।
















