শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে বছরের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভোট ঘিরে সহিংসতা ও অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন।
বর্তমানে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। অতীতে বাংলাদেশের নির্বাচনগুলো প্রায়ই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বর্জন ও কারচুপির অভিযোগে বিতর্কিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এলেও, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং দলটির শীর্ষ নেতারা বিচারের মুখোমুখি।
বাংলাদেশে একক কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে। জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের জন্য এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সামরিক শাসনের সময়গুলো এই ধারাকে বারবার ব্যাহত করেছে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ১১টি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
১৯৭০ সালের পাকিস্তান আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব আসনে জয় পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় হলেও বিরোধীদের দমন ও একদলীয় শাসনের অভিযোগ ওঠে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ দীর্ঘ সময় সামরিক ও অস্থির শাসনের মধ্য দিয়ে যায়। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির উত্থান ঘটে এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলটি ক্ষমতায় আসে। আশির দশকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন ও বিতর্কিত নির্বাচন দেশজুড়ে আন্দোলনের জন্ম দেয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে দেখা হয়। এতে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
২০০৬–০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বড় জয় পায়। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বিরোধী দল বর্জন ও কারচুপির অভিযোগে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগ টানা পঞ্চমবার ক্ষমতায় থাকে।
এরপর জুলাই মাসে কোটা সংস্কার ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর নেতৃত্বে দেশ নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। আসন্ন নির্বাচন সেই অধ্যায়ের দিকনির্দেশনা ঠিক করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
















