হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি পথে মাউন্টেন বাইক চালিয়ে নামার অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর, শ্বাসরুদ্ধকর এবং কিছুটা শঙ্কারও। নেপালের সোলুখুম্বু জেলার পাহাড়ি পথে এমনই এক অভিযানে অংশ নিচ্ছেন ভ্রমণপ্রেমীরা, যেখানে চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকে তুষারশৃঙ্গের সারি আর আশপাশে স্থানীয় শেরপা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন।
এই অঞ্চলে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণই এত দিন পর্যটনের মূল আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এখন ফাপলু নামের ছোট এক শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে মাউন্টেন বাইকিংয়ের নতুন উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ভ্রমণকারীরা শুধু পাহাড় দেখছেন না, বরং কাছ থেকে অনুভব করছেন প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবন।
ফাপলু মাউন্টেন বাইক ক্লাব নামের একটি অলাভজনক সংগঠন স্থানীয় শেরপা তরুণদের নেতৃত্বে তৈরি করেছে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দীর্ঘ বিভিন্ন মাত্রার ট্রেইল। এই ট্রেইলগুলো রাটনাঙ্গে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত, যেখানে আগে ব্যবহার হতো রাখাল ও কৃষকদের পায়ে চলা পথ হিসেবে। এখন সেই পথেই ছুটছে মাউন্টেন বাইক।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। এভারেস্ট অঞ্চলে কাজ করা অনেক শেরপা মৌসুমি আয় পান, যা সারা বছরের জন্য যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেও তারা আন্তর্জাতিক অভিযাত্রীদের তুলনায় অনেক কম পারিশ্রমিক পান। এই পরিস্থিতিতে মাউন্টেন বাইকিংকে বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
২০২০ সালে এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন নেপালের পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত অ্যাং ছেরিং লামা এবং ফরাসি সাবেক পেশাদার মাউন্টেন বাইকার তাঙ্গি রিবুর। তারা স্থানীয় পরিবারগুলোকে হোমস্টে চালু করতে উৎসাহ দিয়েছেন, যাতে পর্যটকেরা সরাসরি স্থানীয়দের সঙ্গে থাকতে পারেন। পাশাপাশি তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বাইক মেরামত, প্রাথমিক চিকিৎসা ও গাইড হিসেবে কাজ করার বিষয়ে।
ফাপলুতে অবস্থিত হ্যাপি হাউস নামের একটি অতিথিশালা এই উদ্যোগের অন্যতম কেন্দ্র। একসময় এভারেস্টজয়ী এডমন্ড হিলারির পছন্দের এই স্থানে এখন থাকছেন মাউন্টেন বাইকাররা। এখানকার ব্যবস্থাপক মিংমার ইয়াংজি শেরপার মতে, এই অঞ্চলে বাইকিং মানে শুধু খেলাধুলা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ।
এই প্রকল্পের ফলে স্থানীয় তরুণদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ নিয়মিত ট্র্যাকে অনুশীলন করছে, কেউ শিখছে গাইড হওয়ার কৌশল। তরুণীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের আশা, ভবিষ্যতে এখানকার যুবকেরা নিজেরাই পর্যটন ব্যবসার মালিক হবে।
বিশ্বজুড়ে মাউন্টেন বাইকিং শিল্প দ্রুত বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেপালের এই অঞ্চলও পর্যটনের নতুন মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। উঁচু পাহাড়, অনুকূল আবহাওয়া ও বৈচিত্র্যময় পথ এই এলাকার বড় শক্তি।
এভারেস্ট এখনও এই অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে, কিন্তু ফাপলুর এই নীরব কোণে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ভিন্ন এক পর্যটনধারা। এখানে শীর্ষ জয়ের প্রতিযোগিতা নয়, বরং প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের সঙ্গে সংযোগই হয়ে উঠছে মূল আকর্ষণ।















