১৮৬০ সালের ঔপনিবেশিক আইন ও বিচারকের ‘বিবেচনাপ্রসূত’ ক্ষমতার বলি সাধারণ বিচারপ্রার্থী
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এক মারাত্মক ও অলক্ষ্য সমস্যা হলো ‘সেন্টেন্সিং গাইডলাইন’ বা দণ্ডদান নির্দেশিকার অভাব। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রীয় নীতিমালা না থাকায় দেশে একই ধরণের অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন আদালতে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী সাজা দেওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে (পেনাল কোড) অধিকাংশ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তির উল্লেখ থাকলেও সর্বনিম্ন শাস্তির কোনো মানদণ্ড নেই। ফলে সাজা নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বিচারকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিচারব্যবস্থার এই অগোছালো কাঠামো কেবল আইনের সমতার নীতিকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং বিচারবিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও কমিয়ে দিচ্ছে। অপরাধীর সংশোধন ও পুনর্বাসনের চেয়ে কেবল ‘প্রতিশোধমূলক কারাদণ্ড’ দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে আধুনিক ‘স্ট্রাকচার্ড সেন্টেন্সিং’ প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারকদের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা বা ‘Discretionary Power’ যখন কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা ছাড়াই প্রয়োগ করা হয়, তখন তা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।
সাজা নির্ধারণে বৈষম্যের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশে ‘Sentencing Disparities’ বা সাজার বৈষম্য এখন এক রূঢ় বাস্তবতা। একই ধরণের মামলায় ভিন্ন ভিন্ন রায়ের নমুনা নিচে দেওয়া হলো:
- চুরি ও মারধরের মামলা: একই ধরণের চুরির ঘটনায় এক আদালত দিচ্ছে ৬ মাসের জেল, অন্য আদালত দিচ্ছে ৩ বছর। মারধরের মামলায় কেউ জরিমানা দিয়ে মুক্তি পাচ্ছেন, আবার কেউ পাচ্ছেন দীর্ঘ কারাদণ্ড।
- মানদণ্ডের অভাব: শাস্তির উদ্দেশ্য প্রতিরোধ, সংশোধন নাকি পুনর্বাসন—তা স্পষ্ট না হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারাদণ্ডই একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- আইনি অস্পষ্টতা: দণ্ডবিধিতে “Up to” বা “Not exceeding” শব্দ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ সাজা জানানো হলেও, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কতটা সাজা যৌক্তিক হবে, তার কোনো ‘Starting Point’ নির্ধারণ করা নেই।
কাঠামোগত দুর্বলতা ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার
বর্তমান বিচারব্যবস্থার এই অসংগতির মূল কারণ ১৬৫ বছরের পুরোনো আইনি কাঠামো:
১. সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গি: ১৮৬০ সালের পেনাল কোড তৈরি হয়েছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে, যেখানে অপরাধবিজ্ঞানের আধুনিক বিবর্তন বা ‘Behavioral Science’ বিবেচনার সুযোগ ছিল না।
২. প্রবেশন ব্যবস্থার ব্যর্থতা: ১৯৬০ সালের প্রবেশন অধ্যাদেশ থাকলেও জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার হার নগণ্য।
৩. শুনানির অভাব: দোষী সাব্যস্ত করা এবং সাজা ঘোষণার জন্য পৃথক শুনানির কোনো বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশে নেই, যা উন্নত বিশ্বে বাধ্যতামূলক।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বনাম বাংলাদেশ
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সাজা নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে ইতিমধ্যে কঠোর নির্দেশিকা অনুসরণ করছে:
- যুক্তরাজ্য: দেশটির ‘Sentencing Council’ প্রতিটি অপরাধের জন্য ক্ষতি ও দায়বদ্ধতার মাত্রা অনুযায়ী সাজার স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর: এখানে ‘Federal Sentencing Grid’ এবং কঠোর গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়, যা বিচারকের ব্যক্তিগত প্রভাব কমিয়ে দেয়।
- আঞ্চলিক উদাহরণ: ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ইতিমধ্যে তাদের দণ্ডবিধি সংস্কার করে সাজা নির্ধারণের কাঠামো স্পষ্ট করেছে।
উত্তরণের পথ: সংস্কারের ৫ প্রস্তাব
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা নিচের সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন:
১. সেন্টেন্সিং বোর্ড গঠন: বিচারপতি, অপরাধবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জাতীয় বোর্ড গঠন করে নির্দেশিকা তৈরি করা।
২. পৃথক সাজা শুনানি: দণ্ড ঘোষণার আগে অপরাধীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনার জন্য পৃথক শুনানি বাধ্যতামূলক করা।
৩. ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্ট: রায়ের সময় ভুক্তভোগীর শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা।
৪. প্রবেশন কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: কারাবন্দি না রেখে লঘু অপরাধীদের পুনর্বাসনের আওতায় আনতে প্রবেশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
৫. বিচারিক প্রশিক্ষণ: সাজা নির্ধারণের আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বিচারকদের নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান।
সাজা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা না ফিরলে ন্যায়বিচারের মূল দর্শন ‘আইনের চোখে সবাই সমান’—এটি কেবল কাগুজে বুলি হিসেবেই রয়ে যাবে।
















