আধুনিক বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে এক রহস্যময় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘ইকোনমিক হিটম্যান’। এটি এমন প্রভাবশালী পেশাদার বা মধ্যস্থতাকারীদের বোঝায়, যারা উন্নয়ন ঋণ, নীতি-পরামর্শ এবং করপোরেট চুক্তির আড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির ঋণ, অসম চুক্তি এবং কৌশলগত বিনিয়োগে আবদ্ধ করে রাখে। এর ফলে ওই দেশের কৌশলগত সম্পদ, অর্থনৈতিক নীতি এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে।
ড. সেলিম রায়হান ও ড. এম মাশরুর রিয়াজের মতো অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এবং দেশীয় বেসরকারি খাতকে দূরে সরিয়ে রাখার ফলে গত দেড় বছরে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
লুৎফে সিদ্দিকী: সিঙ্গাপুর কানেকশন ও প্রকিউরমেন্ট বিতর্ক
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত হিসেবে লুৎফে সিদ্দিকীর ভূমিকা ছিল বহুমুখী, তবে তার কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি রয়েছে:
- বন্দর ও সিঙ্গাপুর প্রীতি: চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও বে-টার্মিনালে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল’কে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার পেশাগত সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক গোপন ও প্রকাশ্য সভায় অংশ নিয়ে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন।
- কেনাকাটায় বিশেষ আনুকূল্য: জ্বালানি, গম ও চাল আমদানির ক্ষেত্রে সরাসরি সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারীদের প্রাধান্য দেওয়ার নেপথ্যে তার ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। এমনকি ভারত থেকে চাল কেনা হলেও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ছিল সিঙ্গাপুরের।
- শ্রম আইন ও আইএলও চাপ: আইএলও রোডম্যাপ অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধনে তার অতি-সক্রিয়তা তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করার ফলে কারখানায় বহিরাগত রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
আশিক চৌধুরী: ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও এলএনজি চুক্তি
বিডা, বেজা, পিপিপি এবং মিডার (MIDA) মতো গুরুত্বপূর্ণ সব সংস্থার শীর্ষে আশিক চৌধুরীর অবস্থানকে ‘ক্ষমতার নজিরবিহীন কেন্দ্রীকরণ’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
১. বিতর্কিত এলএনজি চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে ২০৩০ সালের আগে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাহীন একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তিনি, যা বিডার চেয়ারম্যান হিসেবে তার এখতিয়ার বহির্ভূত ছিল বলে আলোচনা চলছে।
২. উন্মুক্ত দরপত্রের অনুপস্থিতি: চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় কেন আন্তর্জাতিক ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি অনুসরণ না করে নির্দিষ্ট বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
৩. চমকপ্রদ প্রচারণা বনাম বাস্তব চিত্র: স্টারলিংক বা নাসা’র বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলোকে বিশ্লেষকরা কেবল ‘লোক দেখানো’ কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ
- ড. এম মাশরুর রিয়াজ (চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ): “শুরুতে কিছু ভালো পদক্ষেপ থাকলেও পরে তা আর ‘নেক্সট লেভেল’-এ নেওয়া হয়নি। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।”
- আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ (সভাপতি, বিসিআই): “বন্দর নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একচেটিয়াভাবে। বন্দর থেকে মুনাফা হওয়া সত্ত্বেও কেন চার্জ বাড়ানো হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।”
উপসংহার: সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি
কৌশলগত সম্পদ যেমন বন্দর ও জ্বালানি খাতে বিদেশি করপোরেটদের একচেটিয়া সম্পৃক্ততা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরীর সংস্কার স্পৃহা থাকলেও, তাদের ‘হাই-ভ্যালু’ ডিল কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে জোরালো।
















