পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে একযোগে চালানো হামলায় অন্তত ১৫ জন নিরাপত্তা সদস্য ও ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতায় জর্জরিত এই অঞ্চলে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা।
শনিবার ভোররাতে প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় একাধিক পুলিশ স্টেশনে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সময় রাত প্রায় তিনটার দিকে শুরু হওয়া এসব হামলায় জাতিগত বেলুচ বন্দুকধারীরা জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের মুখে রয়েছে পাকিস্তান। আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তবর্তী খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এই প্রদেশে বিদ্রোহীরা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বিদেশি নাগরিক ও বহিরাগতদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, তারা বেলুচিস্তানের অন্তত নয়টি জেলায় সামরিক স্থাপনা, পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা ও আত্মঘাতী বিস্ফোরণ চালিয়েছে।
চারটি জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো পুরোপুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কোয়েটার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, হামলাকারীরা একজন উপ-জেলা প্রশাসককে অপহরণ করেছে। অন্য একটি জেলার সরকারি কর্মকর্তা বলেন, হামলাকারীরা একটি জেলা কারাগার থেকে অন্তত ৩০ জন বন্দিকে মুক্ত করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করেছে এবং একটি পুলিশ স্টেশনেও হামলা চালিয়েছে।
নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এটি একটি সমন্বিত হামলা ছিল, যা ১২টির বেশি স্থানে সংঘটিত হয়। পাল্টা অভিযানে অন্তত ৯২ জন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। গত ৪৮ ঘণ্টায় নিহত যোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৩ জনে।
বেলুচিস্তান সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্দ জানিয়েছেন, সংগঠনটির অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। তবে বেসামরিক নিহতদের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অতীতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহযোগী মনে করা বেসামরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইসলামাবাদের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, হামলাগুলো সমন্বিত হলেও দুর্বল পরিকল্পনার কারণে দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং কার্যকর নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এক বিবৃতিতে হামলাকারীদের ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ বলে উল্লেখ করেন, যা সরকার বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির জন্য ব্যবহার করে থাকে। তিনি দাবি করেন, এই গোষ্ঠীটি প্রতিবেশী ভারত দ্বারা সমর্থিত। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পেছনে ভারতের মদদের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
ভারত এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
হামলার সময় কয়েকজন নিরাপত্তা সদস্য অপহৃত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইন্টারনেট ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক জ্যাম করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে নিরাপত্তা অভিযান চলছে।
এই হামলার একদিন আগেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানে পৃথক দুটি অভিযানে ৪১ জন সশস্ত্র যোদ্ধাকে হত্যা করার দাবি করেছিল। প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, গত এক বছরে নিরাপত্তা বাহিনী ৭০০ জনের বেশি সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছে এবং সাম্প্রতিক দুই দিনেই প্রায় ৭০ জনকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব হামলা সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সরকারের দৃঢ়তা দুর্বল করতে পারবে না।
বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের কেন্দ্র। প্রদেশটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি হলেও এখানে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও পাকিস্তান তালেবান উভয়ই হামলা জোরদার করেছে। পাকিস্তান তালেবান গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে ধারণা করা হয়।
গত বছর বেলুচ বিদ্রোহীরা ৪৫০ যাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনে হামলা চালিয়ে দুই দিনব্যাপী অবরোধ সৃষ্টি করে, যাতে বহু মানুষ নিহত হয়। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে তারা সেতু উড়িয়ে দেওয়া, হোটেলে হামলা এবং নিরাপত্তা স্থাপনায় আক্রমণ চালিয়ে প্রদেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি করেছিল, যাতে বহু প্রাণহানি ঘটে।
















